২০২৫ সালে প্রকাশিত ‘সমতার ইস্তাহার’ পুস্তিকায় পশ্চাদপদতা বা অসমতার একটি সূচক তৈরি করা হয়েছিল। সূচকটি তৈরি হয়েছিল তিনটি মাপকাঠির ভিত্তিতে — উন্নয়ন, নিরাপত্তা, এবং স্বাধীনতা। উন্নয়নের মধ্যে পড়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কাজ, রোজগার, ব্যবসা, সুপরিবেশ ইত্যাদি। উন্নয়নের পরিমাপের জন্য চারটি প্রতিনিধিত্বমূলক মাপকাঠি নেওয়া হয়েছিল — শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শ্রম, এবং রোজগার। নিরাপত্তার মধ্যে পড়বে কোনও একটা পরিচয়ের জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংগঠিত অপরাধ, জেল-এ থাকা বা গ্রেফতারি, অস্বাভাবিক মৃত্যু, উদ্বাস্তু হওয়া, লকডাউন পরিস্থিতিতে থাকা ইত্যাদি। প্রতিনিধিত্বমূলক তিনটি মাপকাঠি নেওয়া হয়েছে — নিরাপদ, নিরাপরাধ, এবং স্বাভাবিক মৃত্যু। স্বাধীনতার মধ্যে পড়বে অবকাশ, ভ্রমণ, খেলাধূলায় অংশগ্রহণ, বিবাহের বয়সের প্রসার, একত্রবাসের প্রসার, নাস্তিকতার প্রসার, প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় ধর্মপরিবর্তনের বিস্তার, ধর্মীয় বৈচিত্র্য, ব্যক্তির সারা জীবনের একাধিক ধরনের পেশায় সংযুক্তি ইত্যাদি। এক্ষেত্রে যে তিনটি প্রতিনিধিত্বমূলক মাপকাঠি নেওয়া হয়েছে সেগুলি হল — সম্পর্ক, অবিশ্বাস, স্বাধীন পেশা। নিচের পরিচ্ছদগুলিতে এসবগুলিই বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হল।
এখানে আরো একটি বিষয়ে অবগত করা প্রয়োজন। আমরা গড়ের বদলে বিপরীত গড় ব্যবহার করেছি। এমনি গড়-এ যেমন পাঁচটি জিনিসের গড় দাম হল তাদের মোট দামকে পাঁচ দিয়ে ভাগ; বিপরীত গড় এর ইংরেজি হল হারমোনিক মিন, যাতে গড়-এর অনন্যক পাওয়া যায় জিনিসগুলির দামের অনন্যকগুলির যোগফল-কে পাঁচ দিয়ে ভাগ করে। সূচক নির্মাণে বিপরীত গড়ের ব্যবহার অতি-পরিচিত। রাষ্ট্রপুঞ্জের লিঙ্গ-অসমতার সূচকে বিপরীত গড়-এর ব্যবহার আছে। এতে সুবিধা যেটা হয় — যে মাপকাঠির মান সবচেয়ে কম, গড়টি তার কাছাকাছি থাকে। ফলে, “পশ্চাতে রাখিছ যারে, সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে” ব্যাপারটা থাকে সূচক-এ। ভরযুক্ত গড়-ও আমরা ব্যবহার করেছি একেবারে শেষে, যখন উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা সূচকগুলিকে গড় করে সমতা-সূচক বানিয়েছি। ভরযুক্ত গড় মানে হল, পাঁচটি জিনিসের দামে ভিন্ন ভিন্ন গুরুত্ব প্রদান, ধরা যাক তিনটির গুরুত্ব দুই করে এবং দু’টির গুরুত্ব তিন করে। সেক্ষেত্রে, ভরযুক্ত গড় দাম হবে প্রতিটির দামের সঙ্গে তাদের নিজস্ব গুরুত্বগুলিকে গুণ করে তাদের মোট যে যোগফল, তাকে গুরুত্বগুলির যোগফল দিয়ে ভাগ।
উন্নয়নের সূচক
উন্নয়নের সূচকে চারটি প্রত্যক্ষ সূচক বা মাপকাঠি আছে — শিক্ষা মাপকাঠি, স্বাস্থ্য মাপকাঠি, শ্রম মাপকাঠি, রোজগার মাপকাঠি।
শিক্ষা মাপকাঠি — শিক্ষার মাপকাঠি হল কলেজ পাশ, অর্থাৎ, যারা পনেরো বছর (১০+২+৩) পূর্ণ সময়ের পড়াশুনা করেছে, সেই মানুষের সংখ্যা যত শতাংশ, ভগ্নাংশে সেটাই শিক্ষার মাপকাঠি। এই মাপকাঠিটি রাষ্ট্রপুঞ্জেরও উন্নয়ন সূচকের শিক্ষা মাপকাঠি। ২০২৩-২৪ সালের কেন্দ্রীয় সরকারের পরিসংখ্যান ও কর্মসূচী বাস্তবায়ন মন্ত্রকের বাৎসরিক পিরিওডিক লেবার ফোর্স সার্ভে বা ‘পর্যায়ক্রমিক শ্রমশক্তি সমীক্ষা’-তে (টেবিল নং ৮) পশ্চিমবঙ্গে কলেজ পাশ-এর শতাংশ ছিল আট দশমিক এক। সেই অনুসারে শিক্ষা মাপকাঠিতে পশ্চিমবঙ্গর মান ০.০৮১।
স্বাস্থ্য মাপকাঠি — স্বাস্থ্য মাপকাঠি হল গড় আয়ু। পঞ্চাশ ও নব্বই বছর যথাক্রমে ন্যুনতম এবং সর্বোচ্চ। ন্যুনতম মান শূন্য, সর্বোচ্চ মান এক। পশ্চিমবঙ্গের গড় আয়ু, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া-র হ্যান্ডবুক ২০২৪-২৫ অনুযায়ী (টেবিল নং ৭) পশ্চিমবঙ্গের গড় আয়ু ৭২.৫ বছর। ফলে স্বাস্থ্য মাপকাঠিতে পশ্চিমবঙ্গের মান ((৭২.৫-৫০)/৪০=) ০.৫৬২৫।
শ্রম মাপকাঠি — শ্রমের মাপকাঠি হল পনেরো থেকে ষাট বছর বয়সীদের মধ্যে কতজন অর্থনৈতিক কাজ করতে চায়, পরিভাষায় যাকে বলে লেবার ফোর্স পার্টিসিপেশন রেট বা ‘শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার’, তা দিয়ে। এই পরিসংখ্যানটি পাওয়া যায় পূর্বে উল্লিখিত কেন্দ্রীয় সরকারের পরিসংখ্যান ও কর্মসূচী বাস্তবায়ন মন্ত্রকের পিরিওডিক লেবার ফোর্স সার্ভে-র তথ্য থেকে। আমরা ২০২৩-২৪ সালের বাৎসরিক সমীক্ষাটি থেকে এই তথ্য নিচ্ছি (টেবিল নং ১৬)। এখানে কয়েকটি জিনিস উল্লেখ করা প্রয়োজন —
এক) পরিসংখ্যানটি বাৎসরিক সমীক্ষা তথ্য থেকে নিতে হবে, ত্রৈমাসিকের সমীক্ষা থেকে নয়, কারণ অর্থনৈতিক কাজে অংশগ্রহণের হার সব ত্রৈমাসিকে একই রকম থাকে না;
দুই) গ্রাম শহর মিলিয়ে এবং মহিলা ও পুরুষ মিলিয়ে অর্থনৈতিক কাজে অংশগ্রহণের ইচ্ছার গড় পরিসংখ্যানটি নিতে হবে;
তিন) এক্ষেত্রে আমরা ন্যুনতম অংশগ্রহণ ধরব তিরিশ, আর সর্বোচ্চ সত্তর। ন্যুনতম তিরিশ, কারণ এখানে একটা চৌকাঠ রাখা প্রয়োজন। আর সর্বোচ্চ সত্তর, তার বেশি নয়, কারণ আমাদের ধারণা অনুসারে একটি সত্যিকারের উন্নত সমাজে সমস্ত কর্মক্ষম বয়সের মানুষের অর্থনৈতিক কাজে অংশ নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। একটা ক্রিটিক্যাল বা জরুরি সংখ্যক মানুষের অর্থনৈতিক কাজে অংশগ্রহণের প্রয়োজন হয়। যাই হোক, পশ্চিমবঙ্গে অর্থনৈতিক কাজে অংশগ্রহণের ইচ্ছার হার ছেষট্টি। তাই শ্রম মাপকাঠিতে পশ্চিমবঙ্গের মান ((৬৬-৩০)/৪০=) ০.৯। বলাই বাহুল্য, অর্থনৈতিক কাজে অংশগ্রহণের ইচ্ছার হারে পশ্চিমবঙ্গে বেশ ওপরের দিকে। এক্ষেত্রে আরও একটা জিনিস উল্লেখ করা প্রয়োজন, আমাদের দেশের পরিসংখ্যান নেওয়ার সময় যারা বিনা পারিশ্রমিকে পারিবারিক অর্থনৈতিক কাজে নিয়োজিত হতে চায়, তাদেরও এই শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের ইচ্ছার হারের মধ্যে ধরা হয় (এবং তাদের অর্থনৈতিক কাজে অংশগ্রহণকারী হিসেবেও ধরা হয়, যে পরিসংখ্যান পাওয়া যায় ওয়র্ক পার্টিসিপেশন রেট বা ‘শ্রমে অংশগ্রহণের হার’ তথ্যটি থেকে)।
রোজগার মাপকাঠি — প্রাপ্তবয়স্কদের (পনেরো থেকে ষাট বছর) বাৎসরিক আয়ের গড় হল রোজগার মাপকাঠি। এক লক্ষ টাকা ন্যুনতম, কুড়ি লক্ষ টাকা সর্বোচ্চ। জন প্রতি রাজ্যওয়ারি আভ্যন্তরীন সম্পদ পরিমাপ থেকে আমরা এর হিসেব পাই। কেন্দ্রীয় সরকারের ২০২৪-২৫ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুসারে (স্ট্যাটিসটিক্যাল অ্যাপেনডিক্স টেবিল ১.১১এ) এই মান এক লক্ষ চুয়ান্ন হাজার একশ’ উনিশ টাকা। সেই অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের রোজগার মাপকাঠিতে মান হয় ((১,৫৪,১১৯ – ১,০০,০০০)/(২০,০০,০০০ – ১,০০,০০০) = ) ০.০২৮৪। কিন্তু আমরা জানি, আয়ের গড় কখনোই মানুষের উপার্জনের গড় অবস্থাকে নির্ধারণ করে না, কারণ গরীব বড়োলোকে আয়ের ফারাক অনেক। তাই আমরা (১-গিনি সূচক) দিয়ে এই মাপকাঠিকে গুণ করছি। এই গিনি সূচক হল অসমতার পরিমাপ। এই মাপ যত শূণ্য-র কাছাকাছি হবে, তত বেশি সমতা আছে সেই সমাজে। আর যত এক-এর কাছাকাছি, তত অসমতা। আমরা (১-গিনি সূচক) দিয়ে গুণ করার ফলে গিনি সূচক যত কম, তত এই গুণফল একের কাছাকাছি চলে আসে এবং গুণের প্রভাব পড়ে না মাপকাঠিতে। কিন্তু গিনি সূচক যদি বেশি হয়, তাহলে রোজগার মাপকাঠি কমে যায়।
প্রসঙ্গতঃ, বিশ্ব ব্যাঙ্ক ভারতের যে গিনি সূচকের মান দেয়, তা মোটেই নির্ভরযোগ্য মান নয়। কারণ, তা মাপা হয় ‘পর্যায়ক্রমিক শ্রমশক্তি সমীক্ষা’ থেকে প্রাপ্ত ভোগের পরিমাণ থেকে। এতে ধরে নেওয়া হয়, মানুষ যত রোজগার করে ততটাই ভোগের পেছনে খরচ করে। কিন্তু আমরা জানি, গরীব মানুষ যদিও যতটা রোজগার করে ততটাই ভোগ করে, মধ্যবিত্ত ও ধনীরা তাদের উপার্জনের একটা অংশ ভোগ এর পেছনে খরচ করে। আর অতিধনীদের তো কথাই নেই। ফলে বিশ্বব্যাঙ্কের মাপা গিনি সূচক আমরা ব্যবহার করছি না। বদলে, আমরা ‘পর্যায়ক্রমিক শ্রমশক্তি সমীক্ষা’ থেকে একদল অর্থনীতিবিদের বানানো (চন্দ্রশেখর, নারাপারাজু এবং শর্মা ২০২১, টেবিল ২) মাসিক আয় নির্ভর একটি গিনি সূচক ব্যবহার করছি। শ্রমশক্তি সমীক্ষা (২০১৮-১৯) এর পরিসংখ্যানের ওপর দাঁড়িয়ে স্বনিযুক্তি, নিয়মিত মাইনে, এবং ক্যাজুয়াল লেবার থেকে হওয়া আয়ের গড় নিয়ে উনারা এই গিনি সূচকটি বানিয়েছিলেন। সেই সূচকে পশ্চিমবঙ্গের গিনি মান ০.৩৮৫। ফলে গিনি সংশোধিত রোজগার মাপকাঠি দাঁড়াচ্ছে ০.০১৭৫।
উন্নয়ন সূচক তৈরি হয় এই চারটি মাপকাঠির মানের বিপরীত গড়ের মাধ্যমে, এবং পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই সূচকের মান ০.০৫৫৩।
নিরাপত্তা সূচক
নিরাপত্তা সূচক তিনটি মাপকাঠি দিয়ে তৈরি — নিরাপদ মাপকাঠি, নিরপরাধ মাপকাঠি, এবং স্বাভাবিক-মৃত্যু মাপকাঠি।
নিরাপদ মাপকাঠি — প্রতি লক্ষ মানুষ পিছু বছরে কত অপরাধ সংগঠিত হয় খাতায় কলমে, তা দিয়ে তৈরি নিরাপদ মাপকাঠি। দশ হল সর্বোচ্চ, একশ’ হল ন্যুনতম। পশ্চিমবঙ্গে প্রতি লক্ষ মানুষ পিছু ১৮২ টির মতো অপরাধ সংগঠিত হয় (কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের প্রকাশনা ‘ক্রাইম ইন ইন্ডিয়া ২০২৩’, ভলিউম এক, টেবিল নং ১এ.৩)। ফলে এই মাপকে পশ্চিমবঙ্গের মান শূণ্য। আমরা বিপরীত গড়ের সময় যাতে হিসেব করা সম্ভব হয়, সেই কারণে কোনও মাপকাঠিতে মান শূণ্য হলে তার একটা মান দিচ্ছি, ০.০০১। এই এক সহস্রাংশ মান এই কারণে, যাতে তা বিপরীত গড়ের সময় স্বাভাবিক মানের নিম্নসীমা (যা এক শতাংশ বা তার খুব কাছাকাছি) থেকে খুব দূরে না হয়।
নিরপরাধ মাপকাঠি — প্রতি লক্ষ মানুষ পিছু কত জন গ্রেপ্তার হয় বছরে, তা দিয়ে নিরপরাধ মাপকাঠি। এই মাপকাঠি দিয়ে আমরা অপরাধীকরণ মাপছি। পশ্চিমবঙ্গে এর সংখ্যা ১৩১ (কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের প্রকাশনা ‘ক্রাইম ইন ইন্ডিয়া ২০২৩’, ভলিউম তিন, টেবিল নং ১৯এ.৬। জনসংখ্যা ৯৯২.৪ লক্ষ আনুমানিক ওই সময়ে, যার হিসেব ভলিউম এক এ দেওয়া হয়েছিল।) এখানেও দশ হল সর্বোচ্চ, একশ’ হল ন্যুনতম। ফলে পশ্চিমবঙ্গের এই মাপকাঠিতে মান শূণ্য।
স্বাভাবিক-মৃত্যু মাপকাঠি — প্রতি লক্ষ মানুষ পিছু কত জন অস্বাভাবিক ভাবে মারা যায় বছরে, তা দিয়ে তৈরি স্বাভাবিক-মৃত্যু মাপকাঠি। এখানে অস্বাভাবিক মৃত্যুর মধ্যে যে কোনও ধরনের হত্যা, জেলে বন্দী অবস্থায় মৃত্যু, আত্মহত্যা, এবং দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু পড়বে। আমাদের ধারণায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে মৃত্যু থেকে শুরু করে আত্মহত্যা — সবই মানুষের অনিরাপত্তার লক্ষণ। যাই হোক, পশ্চিমবঙ্গে প্রতি এক লক্ষে তিরিশ জন অস্বাভাবিকভাবে মারা যায় (মার্ডার ১.৭, সূত্র: কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের প্রকাশনা ‘ক্রাইম ইন ইন্ডিয়া ২০২৩’, ভলিউম এক, টেবিল নং ২এ.১; দুর্ঘটনায় মৃত্যু ১৪.৯ এবং আত্মহত্যা ১২.৯, সূত্র: ‘অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথস এন্ড সুইসাইডস ইন ইন্ডিয়া ২০২৩’, টেবিল নং ১.২ ও ২.২; বন্দী অবস্থায় মৃত্যু ০.১৫, সূত্র: ‘প্রিজন স্ট্যাটিস্টিক্স ইন ইন্ডিয়া, ২০২৩, টেবিল ৮.১)। এই মাপকাঠিতেও সর্বোচ্চ হল দশ, সর্বনিম্ন হল একশ’। এই হিসেবটা হয় — সর্বনিম্ন মান ১০০ থেকে লক্ষজনে অস্বাভাবিক মৃত্যুর সংখ্যা বিয়োগ করে তাকে (১০০-১০=) ৯০ দিয়ে ভাগ। পশ্চিমবঙ্গের এই মান ০.৭৮।
তিনটি মাপকাঠির বিপরীত গড় দিয়ে আমরা নিরাপত্তা সূচক তৈরি করি। যেহেতু দু’টি মাপকাঠিতে পশ্চিমবঙ্গের মান ন্যুনতম, তাই স্বাভাবিক-মৃত্যু মাপকাঠিতে মান ভালো হলেও নিরাপত্তা সূচকে পশ্চিমবঙ্গের মান এক সহস্রাংশে কাছাকাছি (০.০০১৪৯৯), বা প্রায় ন্যুনতম। প্রসঙ্গতঃ, বিপরীত গড় নেবার কারণ — এতে কোনও একটি মাপকাঠিতে মান যদি খারাপ হয়, তাহলে বাকিগুলিতে ভালো মান হলেও গড়টি বা সূচকটি খারাপ হয়ে যায়।
স্বাধীনতা সূচক
সম্পর্ক মাপকাঠি, অবিশ্বাসের মাপকাঠি এবং স্বাধীন-পেশা মাপকাঠি দিয়ে এই সূচকটি তৈরি।
সম্পর্ক মাপকাঠি — সম্পর্কের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে আমরা মেয়েদের প্রথম বিয়ের গড় বয়স নিচ্ছি। কুড়ি বছর ন্যুনতম, তিরিশ সর্বোচ্চ। বয়স বাড়ার সাথে সাথে মেয়েদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বাধীন মতামতের সম্ভবনা বাড়ে। সেই কারণে ন্যুনতম কুড়ি রাখা হয়েছে। বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়েরা সন্তান ধারনের কথা মাথায় রাখে, তাই তিরিশ সর্বোচ্চ ধরা হয়েছে। আমরা বিয়েকে সন্তান ধারনের থেকে বিযুক্ত করছি না এখানে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স ১৭.৮ (ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে-৫ (২০১৯-২১), পশ্চিমবঙ্গ, টেবিল নং ৪০)। সম্পর্ক মাপকাঠিতে মান ন্যুনতম।
অবিশ্বাস মাপকাঠি — এই মাপকাঠিটি যারা ঈশ্বরে অবিশ্বাসী তাদের জনসংখ্যায় অনুপাত। ন্যুনতম এক শতাংশ। সর্বোচ্চ দশ শতাংশ। শেষতম জনগণনা (২০১১) অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে ধর্মবিশ্বাস জানাতে চান না এরকম মানুষের সংখ্যা ছিল দুই লক্ষ আঠাশ হাজার, যা মোট তৎকালীন জনসংখ্যার ০.২৫ শতাংশ। অতএব, এই মাপকাঠিতে পশ্চিমবঙ্গের মান ন্যুনতম। প্রসঙ্গতঃ, আমাদের দেশে জনগণনায় সরাসরি অবিশ্বাসীর সংখ্যা মাপা হয় না। ছ’টি মূল ধর্ম বাদে আর দু’টি কলাম থাকে, একটি অন্যান্য ধর্ম, আরেকটি যারা ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে জানাতে চান না। আমরা শেষ কলামটির পরিসংখ্যান নিয়েছি।
স্বাধীন-পেশা মাপকাঠি — এই মাপকাঠিটি ‘পর্যায়ক্রমিক শ্রমশক্তি সমীক্ষা’ (২০২৩-২৪) এ স্বাধীন পেশাজীবীদের পরিসংখ্যান থেকে নেওয়া (টেবিল নং ১৯)। যারা স্বনিযুক্ত, এবং যারা অন্যদের নিয়োগ করে, তাদের মিলিত পরিসংখ্যান নেওয়া হয়েছে। এই মান ০.৪৩।
যেহেতু তিনটে মাপকাঠির দুটিতেই ন্যুনতম মান, তাই বিপরীত গড়ে পশ্চিমবঙ্গে স্বাধীনতার সূচক-ও প্রায় ন্যুনতম, এক সহস্রাংশের কাছাকাছি (০.০০১৪৯৮)।
আমরা এই তিন সূচকের গুরুত্ব-যুক্ত গড়-কেই ধরছি সমতার সূচক — উন্নয়নের সূচকের গুরুত্ব তিন, নিরাপত্তা সূচকের গুরুত্ব দুই, এবং স্বাধীনতা সূচকের গুরুত্ব এক। সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সমতা-সূচক ০.০২৮৪, অর্থাৎ প্রায় ন্যুনতম।
| সমতা সূচক (নিচের সূচকগুলির ভরযুক্ত গড়, ভরগুলি যথাক্রমে ৩, ১, এবং ২) | ০.০২৮৪০৪০৮৩ |
| উন্নয়ন সূচক (নিচের মাপকাঠিগুলির বিপরীত গড়) | ০.০৫৫৩০৯৩৯ |
| শিক্ষা মাপকাঠি | ০.০৮১ |
| স্বাস্থ্য মাপকাঠি | ০.৫৬২৫ |
| শ্রম মাপকাঠি | ০.৯ |
| রোজগার মাপকাঠি | ০.০১৭৫ |
| স্বাধীনতা সূচক (নিচের মাপকাঠিগুলির বিপরীত গড়) | ০.০০১৪৯৮২৫৮ |
| সম্পর্ক মাপকাঠি | ০.০০১ |
| অবিশ্বাস মাপকাঠি | ০.০০১ |
| স্বাধীন-পেশা মাপকাঠি | ০.৪৩ |
| নিরাপত্তা সূচক (নিচের মাপকাঠিগুলির বিপরীত গড়) | ০.০০১৪৯৯০৩৬ |
| নিরাপদ মাপকাঠি | ০.০০১ |
| নিরপরাধ মাপকাঠি | ০.০০১ |
| স্বাভাবিক-মৃত্যু মাপকাঠি | ০.৭৮ |