কিছু প্রশ্ন এবং যাপনবাদ নিয়ে আলোচনার একটা সুযোগ হয়েছিল মে মাসে, কল্যাণীতে। পরে প্রশ্নগুলির আলোচনা লিখিতভাবে উদ্যোক্তাদের পাঠানো হয়। এখানে তা রইল।
১. আমরা জেনে এসেছি যে কোন সমাজ ব্যবস্থা টিকে থাকে সমসাময়িক বিরাজমান উৎপাদন সম্পর্কের উপর নির্ভর করে। মানব সভ্যতার বিকাশের পথে বিভিন্ন ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তন আমরা দেখে এসেছি। আদিম সাম্যবাদী সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থার কি কি পরিবর্তনের ফলে মানবসমাজের উৎপাদন সম্পর্ক পরিবর্তিত হয়ে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব ঘটেছিল?
আদিম সাম্যবাদী ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এমন এক ঐতিহাসিক ঘটনা যা নানা জায়গায় নানা সময় ঘটেছিল বলে যেটুকু যা তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে তার থেকে আন্দাজ করা যায়। কেন ভেঙে পড়েছিল, সে সম্পর্কেও স্বাভাবিকভাবে নানা বক্তব্য আছে। মার্ক্সের সময়ে পড়াশুনার ভিত্তিতে তাকে বলা হয়েছিল, শ্রেণীর উৎপত্তি। তা যেমন নিজস্বভাবে, তেমনি উপনিবেশের কারণে। কিন্তু ইতিহাসের এভিডেন্সগুলি তারপর থেকে অনেক বদলেছে। গবেষকরা নানা চিন্তা তৈরি করেছেন। আমি যদিও এই প্রশ্নের উত্তর আগে খুঁজিনি কখনও, তবু ওপর ওপর চোখ বুলিয়ে দেখছি, আদিম সাম্যবাদে অর্থনীতি, ক্ষমতার ব্যবস্থাপনা, শ্রমবিভাজন, উদবৃত্তের ভোগদখল ইত্যাদি কেমন ছিল তাই নিয়ে বিস্তর আলাপ আলোচনা আছে।
ইতিহাসের গবেষণাভিত্তিক তথ্যের ভিত্তিতে ইতিহাসকে দেখার মুশকিল হল — এমন কিছু বয়ান তৈরি করার দরকার পড়ে, এমন কিছু বড়ো ইতিহাসের বয়ান দেবার দরকার পড়ে, যার তুলনায় তথ্য হয় খুবই অপ্রতুল। ভূতত্ত্ব, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়গুলিতে এই সমস্যা খুবই আছে। ফলতঃ সেই বয়ান অনেকটাই যে লিখছে, তার কল্পনার ছাপে ছয়লাপ থাকে। সেই কল্পনাও তৈরি হয় একেবারেই বর্তমানের মোটিফ গুলির ওপর দাঁড়িয়ে, কারণ যে লিখছে, সে ঘনঘোর বর্তমান। আবার মার্ক্সের বর্তমান আমাদের কাছে একটা ঐতিহাসিক ব্যাপার। ফলে, তার ব্যাখ্যা খুবই লাগসই হয়ে উঠছে তার সময়ের বর্তমান ইউরোপের শ্রেণীবিভক্ত রূপান্তর ঘটানোর চাহিদার সঙ্গে। কেউ বলতে পারে, ট্রান্সফর্মেশনাল পলিটিক্স না করলেই তো আর সমসাময়িক মোটিফ থাকবে না। এ কথা যে বলা যাবে না, সেটাও মার্ক্সই বলে গেছিলেন। ট্রান্সফর্মেশনাল পলিটিক্স না করলে মূলধারার ভাবনাগুলিই মোটিফ খুঁজে দেবে [ইতিহাস গবেষণারও], এবং তা অবধারিতভাবে সমসাময়িকের যে শ্রেণীসম্পর্ক — তাকে টিঁকিয়ে রাখতে চাইবে। একভাবে মার্ক্স এখানে চিন্তার বা গবেষণার মোটিফের রূপটিকেই প্রশ্ন করেছিলেন — তার সার্বজনীনতা ও চিরকালীনতাকে অস্বীকার করেছিলেন। তার সূত্র ধরে বলা যায়, ইতিহাস লেখা হয় সমসাময়িকের প্রয়োজনে। বিশেষ করে কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা বা রূপান্তরের বয়ানের ক্ষেত্রে তো এ কথা খুবই প্রযোজ্য। ফলে, আদিম সাম্যবাদী ব্যবস্থা ভেঙে পড়ল কেন বা কীভাবে, তার কোনও বস্তুনিষ্ঠ ও সাধারণগ্রাহ্য কারণ বলা সম্ভব নয়। আমরা খুব বেশি হলে আদিম সাম্যবাদী ব্যবস্থা এবং পরবর্তী ব্যবস্থাগুলির মধ্যে মৌলিক ফারাক কী কী সেগুলি তথ্যনিষ্ঠভাবে লিপিবদ্ধ করতে পারি। এছাড়াও, কোনও ঘটনাকেই তার কারণের অধীনে দেখার মধ্যে একটা অসুবিধা আছে, তা হল, কারণের চেয়ে ঘটনা অনেকবেশি আসল — এই বস্তুনিষ্ঠতাকে তাতে অস্বীকার করা হয়। যদিও আমরা সকলেই অভ্যাসবশতঃ এটা করে থাকি, এবং এতে আমাদের ঘটনাকে স্বীকার করতে সুবিধা হয়, এবং কখনও কখনও (দুরর)ঘটনাপূর্ব দশাকে ফিরে পাওয়ার পরিকল্পনা করতে। কিন্তু একটা জিনিস ভেবে দেখার মতো — কারণ ঘটনাকে তৈরি করে না; ঘটনা ঘটে, তার অবশ্যই নানা কারণ থাকে; এবং তার মধ্যে কোনও একটা কারণের ভূমিকা অন্য কারণগুলির চেয়ে বেশি থাকে স্বাভাবিকভাবেই এবং সেটাকে সে কারণে মূল কারণ বলে অভিহিত করাও যেতে পারে।
ফলে এখন আমরা যখন প্রশ্নটার উত্তর খুঁজতে বসব, তখন তথ্যের অপ্রতুলতা ইত্যাদি নানা সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি আরেকটা সীমাবদ্ধতাকেও স্বীকার করে নেব — আমরা ‘অমুক’ মোটিফ থেকে প্রশ্নটার উত্তর খুঁজছি। ওই অমুক মোটিফ-টি কী কী দিয়ে বানানো? প্রথমতঃ তা যাতে আমাদের ইতিহাস পাঠ আমাদের বর্তমানকে প্রভাবিত করতে পারে। দ্বিতীয়তঃ যাতে তা বর্তমানের কোনও জ্বলন্ত সমস্যা তথা প্রশ্ন-র উত্তর দেবার বা প্রশ্ন-টার মোড় ঘোরানোর সক্ষমতা প্রদান করে। তৃতীয়তঃ যাতে তা আমাদের দিশা দেখায়। এইরকম। একমাত্র তবেই আমরা বর্তমান চালু ভাবনাগুলির খপ্পর থেকে মুক্ত হয়ে ঐ ইতিহাসের প্রশ্নটার উত্তর খুঁজতে পারি।
সেই সীমাবদ্ধতা (সীমাবদ্ধতা আমাদের কাছে ইতিবাচকতা, তাকে যেরকম নেতিবাচকভাবে দেখার চল আছে সেভাবে আমরা মোটেই দেখি না) নিয়েই একটা আন্দাজ দিতে পারি, কারণ আগেই বললাম, প্রশ্নটার উত্তর আমি খুঁজিনি বা খুঁজবার কথা ভাবিনি। আন্দাজটা হল — মানুষের তখন মূল এনগেজমেন্ট ছিল প্রকৃতির সঙ্গে। সেই অস্তিত্বকে বলা যেতে পারে প্রাকৃতিক অস্তিত্ব এবং প্রাকৃতিক-সামাজিক অস্তিত্ব। পরে আস্তে আস্তে যখন মানব অস্তিত্ব সামাজিক-প্রাকৃতিক অস্তিত্বে রূপান্তরিত হতে থাকল, কারণ ততদিনে মানুষ অভিজ্ঞতা অর্জন করে ফেলেছে, কীভাবে প্রকৃতির সঙ্গে চলা যায়, তখন থেকে মানুষের সমাজের সঙ্গে এনগেজমেন্ট তুলনায় বড়ো হয়ে দেখা দিল। শ্রমবিভাজন কনসলিডেট করল। তা বংশপরম্পরাকে অধিকার করল। অর্থাৎ যতদিন বাঘ ছিল মাথাব্যাথা, বান ছিল মাথাব্যাথা ইত্যাদি ইত্যাদি — ততদিন সমাজ মানুষের তত মাথাব্যাথা হয়নি। যখন থেকে সে সেসবকে বাহির করল, তখন তার অন্দরের দিকে চোখ পড়ল। তখন থেকেই ক্ষমতার একটা প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল। অর্থনীতি তো শেষ বিচারে সামাজিক সংগঠন, সামাজিক পরিপাকতন্ত্রের। বর্তমানে আমরা সামাজিক অস্তিত্ব পেরিয়ে মনোসামাজিক অস্তিত্বে চলে যাচ্ছি। সামাজিকতায় মন একটা নির্ধারক জায়গা নিয়ে ফেলছে। ফলে সমাজ সংগঠনে (তার মধ্যে সামাজিক পরিপাকতন্ত্র অন্তর্ভুক্ত) আরেকটি মৌলিক পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী।
২) আমরা লক্ষ্য করে থাকবাে কোন সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের সামাজিক চেতনাবােধ সমসাময়িক সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থা এবং উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে উদ্ভূত উৎপাদন সম্পর্কের উপর নির্ভরশীল।
উৎপাদন ব্যবস্থা এবং উৎপাদন সম্পর্কের এই দ্বান্দ্বিক গতিশীল পরিবর্তন মানুষের সামাজিক চেতনার বিকাশের বস্তুগত ভিত্তি হয়ে থাকে। বর্তমান সমসাময়িক পুঁজিবাদী সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থা ও উৎপাদন সম্পর্ক সবচাইতে জটিল ও নিবিড়ভাবে মানুষের সামাজিক চেতনাবােধকে গড়ে তােলে। ভবিষ্যৎ সমাজতান্ত্রিক সমাজের অভিমুখ বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজের অভিমুখের তুলনায় কি কি ভাবে পৃথক হতে পারে? সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা কি কি ভাবে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে গুণগত পরিবর্তন দাবী করে? আবার সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে উদ্ভূত যে উৎপাদন সম্পর্ক তা পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্ক থেকে কি কি দৃষ্টিতে গুণগত পৃথক হতে পারে? সামাজিক চেতনা বিকাশের পূর্বোক্ত ব্যাখ্যার নিরিখে সমাজতান্ত্রিক চেতনার বস্তুগত ও দার্শনিক ভিত্তি কি হতে পারে?
মার্ক্সবাদী লেখাপত্রে উৎপাদন ব্যবস্থা ও উৎপাদন সম্পর্ককে বেশি জোর দেওয়া হয়, সম্ভবতঃ পুঁজিবাদী সমাজে উৎপাদন ব্যবস্থা হল সামাজিক পরিপাকতন্ত্রের সেই অংশটা যার মধ্যে থেকে পুঁজি ও তার দ্বান্দ্বিক অপর যে, শ্রম – তা তৈরি হয়। শ্রম (অর্থাৎ তার ব্যক্তিক শরীর, শ্রমিক) উৎপাদন হয় বলে, যা-ই কেবল মাত্র পুঁজি-র নেতি, এবং যার ক্ষমতা আছে পুঁজিপতিকে ছুটি করে দিয়ে উৎপাদনের উপকরণের সদব্যবহার করার মাধ্যমে পুঁজিবাদের অবসান ঘটানোর। এই কারণেই সম্ভবতঃ উৎপাদন ব্যবস্থা ও উৎপাদন সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু সামাজিক পরিপাকতন্ত্রে উৎপাদন, বন্টন এবং ভোগ — এই তিনটেই সমাজ গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভবতঃ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভোগ। ঐটি না হলে পরিপাকতন্ত্রটি পরিপাকতন্ত্রই হবে না। পুঁজিবাদ সে কারণে এই তিনটিকেই সমান গুরুত্ব দেয়। বরং সে অধুনা উৎপাদন ব্যবস্থাটিকে আর বেশি গুরুত্ব দেয় না। উৎপাদনের ডিস্কিলিং এবং স্বয়ংক্রিয়করণের মধ্যে দিয়ে উৎপাদন এখন অনেকটাই সহজ হয়ে গেছে। তুলনায় ভোগ ও বন্টন — এই দুই ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা অনেক বেশি। সেই অনিশ্চয়তা পেরিয়ে পরিপাকতন্ত্রটি বহাল রাখা পুঁজিবাদের চ্যালেঞ্জ।
ফলে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার বদলে সামাজিক পরিপাকতন্ত্রের পুঁজিবাদী ব্যবস্থা — এইভাবে দেখলে ভালো হয়। এবং সেক্ষেত্রে উৎপাদন, বন্টন ও ভোগ — এই তিনটিই গুরুত্বপূর্ণ। এই তিনটিকেই কোরাপ্ট করেছে পুঁজি। শুধু উৎপাদন ব্যবস্থাকে করেনি। উৎপাদন প্রক্রিয়াটি যেমন হয়েছে মেশিনের কাছে উৎপাদকের বশ্যতার মাধ্যমে, যা জীবন্ত শ্রমকে গুরুত্বহীন করেছে উৎপাদন ব্যবস্থাটির মধ্যে। বন্টনকে করেছে যথাসম্ভব যান্ত্রিক, হাট-বাজার-কে দখল করে তা যে একইসাথে মানুষের মিলনক্ষেত্রও, তাকে নষ্ঠ করে, পিয়ার-টু-পিয়ার বন্টনের দিকে এগোচ্ছে (এই ক্ষেত্রটি সবচেয়ে বেশি রেজিস্ট্যান্স দিচ্ছে এখন)। ভোগ-এর ক্ষেত্রেও ভোক্তার আনন্দ বা ভোগ থেকে তাকে বিচ্যুত করেছে তাকে (উদাঃ — লোকে ছবির মতো করে ছবির খাবার খায় ও মজা পায় ইত্যাদি)।
সমাজতান্ত্রিক চেতনার বস্তুগত ভিত্তি মানুষের নাছোড় বাসনা। সে ছবির মতো করে ছবির খাবার খেয়ে সাময়িক মজা পেতে পারে, কিন্তু তা কখনোই তার ভোগের বাসনা, তার প্রতিটি স্বাদগ্রন্থির নিজস্ব বাসনা, প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গর নিজস্ব পুষ্টির বাসনা ইত্যাদিকে পূরণ করতে পারে না, কারণ ওই স্বাদগ্রন্থী, ওই পুষ্টি — সেগুলো তৈরি হয়েছে বহু বহু জন্মের অভ্যাসের মধ্যে দিয়ে। তাদের নিজস্ব বেঁচে থাকাগুলো এতটাই বাস্তব ব্যাপার — সেগুলো নিয়েই তৈরি হয় ব্যক্তির ভোগের বাসনা। তা কখনওই চোখের খিদে পূরণের মাধ্যমে পূরণ হয় না। মানুষের নাছোড় বাসনাগুলি এতটাই বাস্তব, খন্ড খন্ড — যে — তাকে কিছুতেই ছাড়া যায় না। তা ব্যক্তি মানুষের চেতনার (ইচ্ছা বা অনিচ্ছার) ব্যাপারও নয়।
আমাদের মনে হয়, পুঁজিবাদের পর সমাজতন্ত্র আসবে, একটা ইপকাল ব্যাপার হবে — এরকম ভাবার ধরন ঠিক না। আমরা ইতিহাস পড়তে অভ্যস্ত হই রোমান সাম্রাজ্যের পতন, গুপ্ত সাম্রাজ্যের বিস্তার এই ভাবে পড়ে। সেই মতো আমরা পুঁজিবাদ সামন্ততন্ত্র ইত্যাদিকে ঐতিহাসিকতায় দেখতেই অভ্যস্ত হই। বস্তুত, মার্ক্সবাদী লেখাপত্রে ছেয়ে আছে ইতিহাস। অনেক সময় বোঝাই দায় হয়, সেগুলো রাজনীতির বই, দর্শনের বই, নাকি কেবলই ইতিহাসের বই। বস্তুতঃ ইতিহাস যদি ঘাঁটা যায়, তাহলে দেখা যাবে, বেশিরভাগ সময়েই নানা তন্ত্র নানা ভৌগলিক ভুখন্ডে থেকেছে। এখনও আমরা যদি খতিয়ে দেখি, তাহলে বুঝতে পারব, সারা দুনিয়ার সর্বত্র নিওলিবারেল ক্যাপিটালিজম চলছে না। করোনা অতিমারির রেসপন্স কীভাবে হবে, তাই নিয়ে সারা দুনিয়ার রেসপন্স আলাদা। চীনের জিরো কোভিড পলিসি খুবই উল্লেখযোগ্য। আফ্রিকার টিকা না নিতে চাওয়া খুবই উল্লেখযোগ্য। সারা দুনিয়ায় পুঁজিবাদের অনেকগুলি ধরন চলছে। যেগুলি অতীতের নানা ধরনের বন্দোবস্তের অবশেষ নিজের মধ্যে বহন করে। পুরনো মানেই খারাপ তা-ও নয়। ফলে, সমাজতন্ত্রকে একটা ইপকালিটি (ঐতিহাসিক বাঁক) হিসেবে না দেখে, একটা ট্র্যান্সেন্ডেন্স (উত্তরণ) হিসেবে না দেখে, তার নীতিসমূহকে, বিশেষ করে তার স্তম্ভগুলি – ক্ষমতা বা রাষ্ট্র-র ভূমিকা খুবই কমিয়ে আনা এবং সমাজের সেলফ-অর্গানাইজেশন, এবং উদবৃত্তের সামাজিকীকরণ ও জীবন্ত শ্রমের প্রাধান্য, ও সমতা — এগুলো প্রতিদিন সম্প্রসারিত করার প্রয়াস নেওয়া দরকার, এবং তা অবশ্যই জনতার স্তরে, ছোটো ছোটো স্তরে। আমরা অবশ্যই এর নানা প্রকাশ দেখি-ও। সেগুলোর মধ্যে এফেমেরালিটিও থাকে ও থাকবে। সমতা, জীবন্ত শ্রমের প্রাধান্য, উদবৃত্তের সামাজিকীকরণ, রাষ্ট্রের দৌর্বল্য ও সেলফ অর্গানাইজেশনের কিছু এম্পিরিক্যাল প্যারামিটার বানানো যেতে পারে এবং তাকে মানদন্ড হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। যে কোনও ছোটো ছোটো পরিসর, পরিবার থেকে পাড়া, গ্রাম থেকে শহর, রাজ্য থেকে দেশ, মহাদেশ থেকে বিশ্ব — সবকিছুকেই বিচারে আনা যেতে পারে। কিন্তু স্থানীয় স্তর (পাড়া, কলেজ, গ্রাম, মহল্লা, কমিউনিটি — এগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ) এবং অবশ্যই কোনও অথরিটি তৈরি করা উচিত নয়, যারা স্ট্যাম্প লাগাবে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মতোই কমিউনিস্ট ইতিহাসও এই স্ট্যাম্প লাগানো অথরিটির ইতিহাস (তৃতীয় আন্তর্জাতিক ইত্যাদি)। বরং এই প্যারামিটারগুলি একটা ইডিওলজি বা আদর্শের মতো কাজ করতে পারে (আমরা যাপনবাদ-এ এক্সাক্টলি এটাই করেছি), যা মানুষকে দিশা দেখাবে। মানুষকে। কোনও ভ্যানগার্ডকে নয়। ‘ভ্যানগার্ড’কেও মানুষেরই একজন বলে ধরতে হবে। বলাই বাহুল্য, এসবের জন্য প্রয়োজন অর্থনীতিকে সামাজিকতায় দেখা। অর্থনীতিকে অর্থনীতির বাইরে গিয়ে দেখা। অর্থনীতিকে সেখান থেকে দেখা যার জন্য অর্থনীতি। জার্মান ইডিওলজির মার্ক্সের ভাষায়, জীবনের পুনরুৎপাদন দিয়ে দেখা অর্থনীতিকে। এবং অর্থনীতি নামক যে ফেটিশ অর্থনীতিবিদরা তৈরি করে, এবং বেশিরভাগ সময়ই মার্ক্সবাদীরাও যে ফাঁদে পা দেয় — তাকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করা।
৩. ক) পুঁজিবাদী সমাজের মূল পরিচয় পুঁজি ও শ্রম এর মধ্যে অমীমাংসেয় দ্বন্দ্ব। অথচ আমরা অহরহ পুঁজি ও শ্রমের দ্বন্দ্বের মীমাংসার প্রচেষ্টা পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যে প্রত্যক্ষ করে থাকি। পুঁজি ও শ্রমের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব কি পুঁজিবাদের অধীনেই মীমাংসা / নিরসন সম্ভব নয়? বিশেষ করে আধুনিক ইউরােপীয় সমাজের বিভিন্ন দেশে যে ধরনের সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া গেছে তার অভিজ্ঞতার আলােকে পুঁজিবাদের অধীনেই সমাজতন্ত্রিক সমাজের কল্পনা কি অবাস্তব ? খ) আমরা জেনে এসেছি যে মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশের অঙ্গ স্বরূপ পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে উন্নততর সমাজ ব্যবস্থা হিসাবে সমাজতন্ত্র জন্ম নেবে। পুঁজিবাদী রাজনৈতিক অর্থনীতির উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা উৎপাদন সম্পর্কের ধ্বংস অনিবার্য। পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার ধ্বংসের অনিবার্যতাতত্ত্বের দার্শনিক ও বস্তুগত ভিত্তি কি? পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বাইরে পুঁজি ও শ্রমের দ্বন্দ্ব নিরসনের প্রচেষ্টা অর্থাৎ পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা এবং উৎপাদন সম্পর্কে উৎখাত করার ভাবনা ও প্রচেষ্টা মুক্তিকামী মানুষের মধ্যে কেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে তৈরি হয়ে ওঠে না?
আমরা মনে করি, পুঁজির চেয়েও মূল ব্যাপার হল পুঁজিকরণ এবং সেটা কাজ করে মানুষের মনোসামাজিক স্তরে। উদবৃত্ত (মূল্যে)র বাসনা কে আমরা মনে করি মানুষের মৌলিক একটি বৈশিষ্ট্য, যে বাসনা দিয়েই সে দৈনন্দিনের সীমা লঙ্ঘন করে। সে নানা কিছু পায়, নানা কিছু বানায়, নানা কিছু আবিষ্কার করে, নানা কিছু শেখে, নানা কিছু লেখে ইত্যাদি। উদবৃত্ত (মূল্য) হল সুফল — যা মোটেই অর্থনীতির পরিবেষ্টনে বাঁধা কিছু নয়, যা তাকে ছাপিয়ে চলে যায় জীবনের মধ্যে, জীবনযাপনের মধ্যে। পুঁজিকরণ হল উদবৃত্ত মূল্য আত্মসাৎ বা সুফল ভোগের বাসনা। পুঁজি সবসময়েই অগ্রিম। পুঁজি হল ভবিষ্যতের বা নয়া কিছুর সারাৎসার নিজের বর্তমানের মধ্যে আত্মসাৎ-এর বাসনাযন্ত্র। অর্থাৎ ভবিষ্যতের সুফল-কে নিজের বর্তমানের শেকল দিয়ে বেঁধে ফেলার বাসনা। ভবিষ্যত-কে বর্তমান দিয়ে নিয়ন্ত্রণ। পুঁজিবাদ হল এই বাসনাযন্ত্রের আধিপত্য। পুঁজি অর্থনীতির মধ্যের ব্যাপার। কিন্তু পুঁজিকরণ অর্থনীতি বহির্ভূত। যে কারণে স্টার্ট-আপ, প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্টের জন্য কনটেস্ট — এইসব করতে হয় সারাক্ষণ। যে কারণে কর্পোরেট স্ট্রাকচারের মধ্যে থেকে কোনও নতুন পণ্য তৈরি হয় না। নতুন পণ্য মূলতঃ তৈরি হয় কলেজের হোস্টেলে, বাড়ির গ্যারেজে, পাড়ায় বা হাটেবাজারে। সমাজের মধ্যে। কর্পোরেট সেগুলো ‘অ্যাকুয়ার’ করে।
আগেই বলেছি, সমাজতন্ত্র মানে সামাজিক সুরক্ষা নয়। আমরা মনে করি, সমাজতান্ত্রিক আদর্শের-র চারটি মূল স্তম্ভ – মানুষের বহুবিবিধ যাপনের পরম ও সার্বিক প্রাধান্য এবং ক্ষমতার বিলোপ (উইদার অ্যাওয়ে), সমাজমুখী (সমাজ বলতে বহু মানুষের দৈনন্দিন জীবন) উদবৃত্ত বা সুফল, জীবন্ত শ্রমের পরম ও সার্বিক প্রাধান্য, সমতা। এবং তা কোনও ট্রান্সেন্ডেন্স (উত্তরণ) নয়, ইপোকাল ব্যবস্থাও নয়। যেহেতু সমাজতন্ত্রকে ট্রান্সেন্ডেন্স ও ইপকাল ব্যবস্থা হিসেবেই দেখা হয়, তাই আমরা সমাজতন্ত্র শব্দটা ব্যাবহারেরও পক্ষপাতী নয়। আমরা এটাকে একটা আংশিক ও ইতিবাচক আদর্শ হিসেবেই দেখি। ইউরোপের যে সামাজিক সুরক্ষা যুক্ত সমাজ, তাকে সোসাল ডেমোক্রেসি বলা যেতে পারে। সোসাল ডেমোক্রেসিও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে একটি জগৎবাদী চরিত্র দেয়। কিন্তু তা পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি অংশ স্বরূপ রাজনীতির নির্মাণ করে। তা পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি ‘ভালো’ রূপের ইউটোপিয়া তৈরি করে। ইউরোপের সামাজিক সুরক্ষা চিরকালই দাঁড়িয়ে ছিল বা আছে তার উপনিবেশ, ভূতপূর্ব উপনিবেশ, খনিজ সম্পদ এবং বাকি পৃথিবীতে তাদের কর্পোরেটদের আধিপত্য ও তজ্জনিত আয়-এর ওপর। ধরা যাক, নরওয়ের পেনশন স্কিম। তারা টাকাটা কোথায় খাটায়? তারা টাকাটা খাটায় নিয়মগিরিতে বেদান্ত-র খনি প্রকল্পের আইপিও কিনে। লগ্নি পুঁজির অংশ না হয়ে কোনও অর্থনৈতিক সুরক্ষা বহাল থাকে না। তাই সামাজিক সুরক্ষা সমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও শুধু সেটা পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার রাজনীতির বা ক্ষমতার রাজনীতির অংশ ছাড়া আর কিছু হতে পারে না।
৪) পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যে সরাসরি প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্কের প্রয়ােজনীয়তা বা সমাজতান্ত্রিক চেতনাবােধ কি স্বাভাবিকভাবেই প্রস্তুত হয়? পুঁজিবাদের ধ্বংস যদি অবশ্যম্ভাবী হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে শ্রমিক শ্রেণীর প্রত্যক্ষ সমাজতান্ত্রিক চেতনাবােধ কিভাবে পুঁজিবাদী সমাজের ধ্বংসের অগ্রদূত ও বাহক ভূমিকা পালন করতে পারে? শ্রমিক শ্রেণীর সমাজতান্ত্রিক চেতনাবােধ যদি পুঁজিবাদের ধ্বংসের পূর্বশর্ত, অনিবার্য ও অবশ্যম্ভাবী হয়ে থাকে তবে এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ধ্বংসের প্রয়ােজনে বৈপ্লবিক রাজনৈতিক দল বা ভ্যানগার্ড পার্টির প্রয়ােজন কি ভাবে এবং কোথায়?
এই প্রশ্নটা সম্পূর্ণভাবে মার্ক্সবাদী আদর্শ (শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব ও সমাজতন্ত্র, বিপ্লবী/তুরীয় আদর্শ) এবং তার পরবর্তী বাস্তবায়ন (পার্টি-বিপ্লব-সমাজতন্ত্র) র ওপর দাঁড়ানো। এগুলো পুরোপুরি ক্ষমতা দখলের পয়েন্টের ওপর দাঁড়িয়ে। আমরা যাপনবাদ নামক জাগতিক আদর্শের কথা বলছি, এবং বিপ্লব, ক্ষমতার রদবদল ইত্যাদিকে প্যারাডক্স বা তুরীয় বিন্দু বা ঐতিহাসিক সিঙ্গুলার পয়েন্ট (ঐতিহাসিক বাঁক নয়, যেখানে ইতিহাস বেঁকে যায়; সিঙ্গুলার পয়েন্ট; ঘটনা) হিসেবে দেখছি। যা কখনওই জাগতিকতার বিকাশের মাধ্যমে তৈরি হবে এমনটা নয়। আমরা হেগেলীয় দ্বন্দ্বের ফ্রেমওয়র্ক রিজেক্ট করছি। ফলতঃ দ্বন্দ্বে (থিসিস-অ্যান্টিথিসিস) অংশগ্রহণের মাধ্যমে দ্বন্দ্বের বিকাশ ঘটিয়ে তুরীয় দশায় পৌঁছনো এবং তার মধ্যে দিয়ে সিনথেসিস — এই গোটা হেগেলীয় যুক্তিকাঠামোকে (যা মার্ক্স গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু হেগেলের হাতে তার চিন্তার পরিসরে বন্দীত্ব দশা থেকে মুক্ত করে তার অ্যান্টিথিসিস অংশটায় বাস্তব মানুষ (শ্রমিকশ্রেণী) -কে স্থাপন করেছিলেন।) আমরা রিজেক্ট করছি। (প্লেটো, কান্ট, ফিস্তে, হেগেল, মার্ক্স -এর) দ্বন্দ্বের বদলে আমরা দেল্যুজের প্রবলেমাটাইজেশন-কে গতির সূত্রের অনেক কাছাকাছি বলে মনে করছি। যদিও এই অংশটা এখনও আমাদের তৈরি করা বাকি আছে, কিন্তু আবছাভাবে আমরা মনে করি, মানুষ তার বহুবিধ বাস্তব যাপনের মধ্যে দিয়ে সমাজের মধ্যে নানামুখী গতি তৈরি করে। সমাজের রূপান্তর ঘটে চলে এই বহুবিধ যাপনকে স্বীকার করার মধ্যে দিয়ে, জটিলতা ধারন করার মধ্যে দিয়ে। আমাদের ভাবনায় সমাজ ডায়ালেক্টিক নয়, মাল্টিলেক্টিক।
যদিও আমরা মনে করি, নানা মতামত যেহেতু আছে ও থাকবে, তাই ট্রান্সেন্ডেন্টাল ইডিওলজি এবং তার বাস্তবায়নও থেকে যাবে। ফলে নানা পার্টি হয়ে উঠতে চাওয়া গ্রুপ থেকে যাবার সম্ভবনাই বেশি। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিতে সেগুলো এই মাল্টিলেক্টিক সামগ্রিক ফ্রেমওয়র্কের অন্তর্গত। তারা যেটা নিজেদের ভাবে, ভ্যানগার্ড রেভলিউশনারি — সেরকমভাবে আমরা তাদের দেখি না।
৫. ক) পুঁজি ও শ্রমের অমীমাংসীয় দ্বন্দ্বের মূল পরিচয় উদ্বৃত্ত মূল্যের আত্মসাৎ। আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজে উদ্বৃত্তমূল্যের ক্রমাগত রূপান্তর ও বিকাশ সবচাইতে জটিল নিবিড় এবং সবচাইতে ঘনীভূত রূপ আমরা প্রত্যক্ষ করি। কার্ল মার্কস পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতি ও সম্পর্কের নির্যাস M-C-M নিয়মে প্রতিষ্ঠা করেন; এই নিয়মের অধীনে M হল উদ্বৃত্ত মূল্যের প্রতিনিধি। পুঁজির পুনরুৎপাদন ও উদ্বৃত্ত মূল্যের অবিরাম নতুনতর গঠন পুঁজিবাদের অধীনে উৎপাদন সম্পর্কের এক চক্রাক্রম(Spiraling Cycle) রূপ। এই চক্রাক্রমে পণ্যমূল্যের উৎপাদন, বন্টন ও নতুনভাবে উদ্বৃত্ত মূল্যের গঠন এক অবিরাম সামাজিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিক ফসল। পুঁজি ও উদ্বৃত্তমূল্যের আত্মসাৎকারী পুঁজিপতি শ্রেণী এবং উদ্বৃত্ত মূল্য সরবরাহকারী সর্বহারা শ্রেণীর তথা অন্য সকল পণ্য উৎপাদক শ্ৰেণী – উভয়ই এই চক্রাক্রমে চালিত উৎপাদন সম্পর্কের অংশীদার ও ভােগী।
পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় উদ্বৃত্তমূল্যের এই সামাজিক ভােগের চরম প্রকাশ বর্তমান পরিবেশ সংকটের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। আমেরিকা, কানাডা ও পশ্চিম ইউরােপের আধুনিক শিল্প-সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত জনসমাজে সামাজিক ভােগের সকল মাত্রার সূচক(Index) পৃথিবীর অন্যান্য সকল দেশ ও জাতির তুলনায় অনেক গুণ বেশি যা আজ পরিবেশ সংকট এর প্রধান বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কারণ। | পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা এবং সম্পর্কের মলভতরূপ এই সামাজিক উদ্বমূল্যকে কি কি ভাবে সুত্রায়িত করা সম্ভব? এই সামাজিক উদ্বৃত্তমূল্যের সূচক(Index) কী কী ভাবে আত্মপ্রকাশ করে? সামাজিক উদ্বৃত্ত মূল্যের অস্তিত্ব কি কি মাত্রায় বস্তুগত ভাবে পরিমাপ করা যেতে পারে? উদ্বৃত্ত মূল্যের সামাজিক পরিচয় ও নির্দিষ্ট পরিমাপ কি আদৌ কি বিশ্লেষণ বিজ্ঞান(Analytical Science) সম্মতভাবে নিদ্ধারণ করা সম্ভব? যদি এই বিশ্লেষণ সম্ভব না হয় তবে উদ্বৃত্ত মূল্য কি কেবল একটি দার্শনিক প্রতিক্রিয়া এবং পুঁজিবাদী সমাজের কেবলমাত্র দার্শনিক প্রতিচ্ছবি? খ) বিংশ শতাব্দীর জুড়ে এ পর্যন্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের যে ইতিহাস আমরা দেখে এসেছি তা হল রাষ্ট্র দ্বারা সামাজিক উদ্বৃত্তের আত্মসাৎ এবং ক্রমপর্যায়ে সর্বত্র আধিপত্যকারী (Totalitarian) রাষ্ট্র দ্বারা উদ্বৃত্ত মূল্যের আত্মসাৎ। বিংশ শতকের সমাজতন্ত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতা হল রাষ্ট্র দ্বারা পরিকল্পিত অভাবনীয় সামাজিক শােষণের পরিত্যক্ত মডেল। সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা কিভাবে রাষ্ট্রীয় পুঁজির অধীন উৎপাদন ব্যবস্থা ও উৎপাদন সম্পর্কে রূপান্তরিত হতে পারে? এই ক্ষেত্রে কি কি ভাবে পুঁজিবাদের অধীনে উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রচলিত জীবিত শ্রমের উপর মৃত শ্রমের (Dead Labour) প্রভুত্ব সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে থেকেছে? পুঁজিবাদী সমাজের অধীনে বিনিময় মূল্যের(Exchange Value) ধারণা সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্কে কিভাবে ফিরে ফিরে আসে? রাষ্ট্রীয় পুঁজির অধীনে উৎপাদন সম্পর্ক থেকে সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্ক কিভাবে গুণগত বিচারে আলাদা হতে পারে?
উদবৃত্ত মূল্য হল সুফল। তা মোটেই পুঁজিবাদী সমাজের দার্শনিক প্রতিচ্ছবি নয়। সংজ্ঞাগতভাবে উদবৃত্ত মূল্যকে অর্থনীতির সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করা অবশ্য কর্তব্য। তার সামাজিক পয়েন্টার তৈরি করা সম্ভব বলেই আমরা মনে করি, পরিমাপ দিয়ে তাকে বোঝা যাবে না পুরোটা। কিন্তু যাপন যেহেতু জাগতিক, সকালে দু-হাতা ভাত রাতে চারটে রুটি ইত্যাদি — ফলে তার জাগতিক বা এম্পিরিক্যাল রূপ অবশ্যই রাখা যায় যা পরিমাপযোগ্য। আমরা মনে করি উদবৃত্তের সামাজিকীকরণ কী তার আলোচনা প্রয়োজন উদাহরণ সহযোগে। আমরা সেরকম কিছু উদাহরণ দিয়েছি। এবং সেই উদাহরণগুলির ওপর জনআন্দোলন তৈরি করা প্রয়োজন। সমস্ত ধরনের যাপনের মধ্যে এগুলি ঢুকে পড়বে। মাথায় রাখা প্রয়োজন, এগুলো ব্যক্তির মরাল বা নৈতিকতা যেন না হয়ে ওঠে।
৬. আধুনিক পুঁজিবাদের চরম প্রকাশ ঘটেছে বিত্তীয় পুঁজির(Finance Capital) রূপধারণে। পুঁজির বিভিন্ন রূপে বিকাশের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পুঁজি রূপান্তরিত হয়েছে বাণিজ্যিক(Mercantile) পুঁজি , ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি বর্তমান বিত্তীয় বিনিয়ােগ পুঁজি(Investment Banking) রূপে। সমাজতান্ত্রিক চেতনার বিকাশে বিত্তীয় পুঁজির এই চরম রূপের প্রভাব ও সম্পর্ক কি? সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় উদ্বৃত্ত উৎপাদন কিভাবে বিত্তীয় পুঁজির রূপ ধারণ করতে পারে? অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় কি ব্যাঙ্কিং, ইনসিওরেন্স প্রভৃতি শিল্পের কোনাে ভূমিকা থাকতে পারে? মুদ্রাব্যবস্থার পর্ণরূপী চরিত্র কি সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্কের অধীনে বিলােপ হতে পারে? কি ধরণের উৎপাদন সম্পর্কের অধীনে মুদ্রার পরিচালন ও পুঁজিতে রূপান্তরিত হওয়ার ক্ষমতা বিলুপ্ত হতে পারে?
লগ্নী পুঁজি হল পুঁজির সঠিকতম রূপ, যার কোনো সামাজিক পিছুটান নেই। এবং লগ্নি পুঁজিকে ইপকাল বা ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া বলা হলেও, এখন যে কোনও পুঁজি খুবই অল্পসময়ের মধ্যেই লগ্নি পুঁজির রূপ গ্রহণ করবেই, নইলে সে পুঁজি হিসেবে টিঁকেই থাকতে পারবে। না। লগ্নি পুঁজির কাঠামো হল কর্পোরেট। যেমন রাষ্ট্রকে দুর্বল করা জনতার অবশ্য কর্তব্য, তেমনি লগ্নিপুঁজিকেও দুর্বল করা জনতার অবশ্য কর্তব্য। আমাদের সময়ে বাসনার সামনে সবথেকে বড়ো বাধা রাষ্ট্র এবং লগ্নিপুঁজি।
শেষে একটি কথা বলার আছে। আমরা যখন রাজনৈতিক দর্শনের চর্চায় ঢুকছি, যাপনবাদ আদর্শের বয়ান তৈরি করছি — তখন আমাদের মধ্যে দুটি উদ্বেগ কাজ করেছে যা এখনও করে। উদ্বেগদুটি হল — এক) শ্রমিকশ্রেণীর বাস্তব উপস্থিতি ছাড়া (এবং তার বিপ্লবী রাজনৈতিক সংগ্রাম ছাড়া), বলাই বাহুল্য যা নেই, মার্ক্সবাদ পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকেই সার্ভ করবে — সে কারণে মার্ক্সবাদকে নিয়ে চলা যাচ্ছে না। দুই) শ্রমিকশ্রেণীর বাস্তব ও রাজনৈতিক উপস্থিতি ছাড়াই গত তিরিশ বছর ধরে নানা লড়াই আন্দোলন সংগ্রাম হয়ে চলেছে (আমরা যাপনবাদ এর বয়ানে তিন নম্বর টিকায় তার কিছু উদাহরন দিয়েছি), এবং উপযুক্ত রাজনৈতিক দর্শন ও আদর্শের অনুপস্থিতিতে সেগুলির অসীম সম্ভবনা থাকা সত্ত্বেও লিবারাল পুঁজিবাদের মধ্যে কো-অপ্টেড হয়ে যাচ্ছে বা তাকেই পুষ্ট করছে। বর্তমান পরিস্থিতি যেহেতু আপনারাও পর্যবেক্ষণ করছেন, আশা করি আপনারাও এই দুই উদ্বেগের সহমর্মী হবেন এবং আমাদের যাপনবাদ-এর প্রয়াসকে তার অন্তর্গত হিসেবে দেখবেন।
সংহতি-তে,
যাপনবাদের প্রস্তাবক-রা, ১৫ মে ২০২২