সোভিয়েত ইত্যাদি সমাজতন্ত্র সম্পর্কে একটি সমালোচনা আমাদের হাতে আসে কিছুদিন আগে।আখ্যানকার সেই সমালোচনার ওপর আলোচনা চেয়েছিলেন। তা করার চেষ্টা করা হল।
মূল লেখা : সমাজবাদ এক অধরা মাধুরী (শুভময় ভট্টাচার্য)
বিগত শতকে সমাজতন্ত্র সম্পর্কে আমাদের যে ভাবনা চিন্তা ছিল, তা ছিল এক ধরনের কল্পনাবিলাসী ভাবনা। আমরা বিশ্বাস করতাম। এখন বুঝি, তা পেটিবুর্জোয়া রােমান্টিকতা ছাড়া আর কিছু নয়। ন্য এর দশকে সােভিয়েত ইউনিয়নের ভার্সন আমাদের বাস্তবের কঠিন জমিতে এনে দাঁড় করিয়েছে। আমরা সমাজতন্ত্র সম্পর্কে নতুন করে প্রশ্ন করতে শিখলাম। বলা যায়, নতুন কিছু প্রশ্নের জন্ম দিল।
সমাজতন্ত্র সম্পর্কে যে ভাবনায় আমরা আচ্ছন্ন ছিলাম সেগুলি ছিল মূলত কতকগুলি রাজনৈতিক ভাষ্য। সেগুলির মধ্যে গভীর কোন অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ ছিল না বললেই চলে।
সমাজতান্ত্রিক সমাজ বলতে যা আমরা অতীতে বুঝেছিলাম তা হলাে, পুরনাে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ধ্বংস করে বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে শ্রমিকশ্রেণী নতুন এক ব্যবস্থার জন্ম দেবে। সেই নতুন শাসন ব্যবস্থাই সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা।
আমাদের চিন্তার মধ্যে যে ফাঁকটি রয়ে গেল তা হলাে নতুন সমাজ ব্যবস্থার নতুন অর্থনীতি কি হবে অর্থাৎ নতুন সমাজতান্ত্রিক সমাজ কি ধরনের অর্থনৈতিক বুনিয়াদের ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে এবং তার রাজনৈতিক দর্শন কী হবে। উপরিউক্ত ভাবনাগুলি আমরা বিগত শতকে ভাবতে পারিনি।
যেকোনাে বুর্জোয়া রাষ্ট্রের মধ্যে প্রধান যে দ্বন্দ্বটি অবস্থান করে তা হল পুঁজি এবং শ্রমের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব। ফলত, সম্পর্কটি দাঁড়ায় শ্রমিক এবং মালিকের দ্বন্দ্ব।
শ্রমিকশ্রেণী ক্ষমতা দখলের পর নতুন রাষ্ট্র নির্মাণ পর্বে প্রথম যে কর্মসূচিটি গ্রহণ করেছিল তা হল ব্যক্তিগত মালিকানার অবসান ঘটানাে। নতুন সরকার সমস্ত ব্যক্তিগত মালিকানাধীন বড় বড় কলকারখানা বাজেয়াপ্ত করলাে এবং সমস্ত কিছুই রাষ্ট্রীয়করণ করলাে। তাহলে নতুন রাষ্ট্রের সাথে শ্রমিকশ্রেণীর সম্পর্ক কি দাঁড়ালাে? আমরা বলশেভিক বিপ্লবের ইতিহাসে দেখলাম, শ্রমিকশ্রেণীর অগ্রণী অংশ বা বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলাে। ব্যক্তিপুঁজি উচ্ছেদ করা হলাে। শিল্পপতিদের বা শিল্প মালিকদের যাবতীয় সম্পত্তি অধিগ্রহণ করা হলাে। এবার দেশ চলবে কি করে? বিগত সরকারের বা পুরােনাে রাষ্ট্রের সম্পত্তি এবং শিল্পপতিদের বাজেয়াপ্ত পুঁজি মিলে তৈরি হলাে রাষ্ট্রীয় পুঁজি। নতুন রাষ্ট্র সেই পুঁজি বিনিয়ােগ করলাে অধিগ্রহণ করা কলকারখানায়। এর ফলে যে পরিবর্তনটি ঘটে গেল তা হলাে, ব্যক্তিপুঁজির পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় পুঁজির বিকাশ হতে থাকলাে। এখন প্রশ্ন হলাে, পুঁজির অর্থ যদি পুঁজ হয় তাহলে যেখানে শ্রমের শােষণ থাকবে। পণ্যের উদ্বৃত্ত মূল্যও সেখানে সৃষ্টি হতে বাধ্য। আমাদের ভাবনায় ফিরে এলাে বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থার পুঁজি এবং শ্রমের মধ্যেকার চিরাচরিত দ্বন্দ্ব। নতুন সমাজ ব্যবস্থায় সেই দ্বন্দ্ব একইভাবে রয়ে গেল। পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রতিনিয়ত উদ্বৃত্তমূল্য সৃষ্টি হয় এবং সেই উওমূল্য আত্মসাৎ করে ব্যক্তি মালিক। তেমনি সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাৎ করে আমলাতন্ত্র এবং পার্টির একাংশ। ফলত, পুঁজি এবং শ্রমের চিরাচরিত দ্বন্দ্বের নিরসন হলাে না। নতুন সােভিয়েত সমাজে ক্ষুদ্র পন্য উৎপাদকেরা পুরােনাে ব্যবস্থার মতােই পন্য উৎপাদন করে বাজারজাত করতাে। এর ফলে ক্ষুদ্র পণ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় মালিক-শ্রমিক সম্পর্কটা রয়েই গেল। এইসব ক্ষুদ্র উৎপাদকেরা প্রতিনিয়ত বৃহৎ পুঁজির জন্ম দিতে লাগলাে। ফলে নতুন শ্রমিকশ্রেণীর সরকার গােটা বাজার ব্যবস্থাকে উপেক্ষা করতে পারল না এবং ধ্বংসও করতে পারল না। বস্তুত, যা দাঁড়াল তা হলাে পণ্য উৎপাদকদের মধ্যে অবাধ প্রতিযােগিতা বেড়েই চলল। নতুন সােভিয়েত সরকার কোথাও কোথাও বাজার ব্যবস্থাকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলাে মাত্র। ক্ষমতা দখলের পর নতুন সােভিয়েত রাষ্ট্র ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিলােপের ডিক্রি জারি করেছিল। কার্যত, সেই ডিক্রি রয়ে গেল কিছু কথার কথা মাত্র।
একইভাবে কৃষিক্ষেত্রে আমরা দেখলাম, ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক কৃষকেরা যৌথ কৃষিখামারে স্বেচ্ছায় আসতে চাইল না। এর প্রধান কারণ, কৃষকদের মধ্যে যে পুরানাে সমান্ততান্ত্রিক ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারনা, যা তখনাে বিদ্যমান। যৌথ খামারের নতুন ধারণার সঙ্গে তা মেলে না। ফলে ধনী কৃষক অর্থাৎ কুলাকরা নতুন সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করল। এইসব ক্ষেত্রে নতুন সরকার ‘ধীরে চলাে’ নীতি গ্রহণ করতে পারত। কিন্তু তা না করে হঠকারী সিদ্ধান্ত নিল। ফলে বিভিন্ন জায়গায় ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে নতুন সরকারের বিরুদ্ধে অসংখ্য ছােট ও বড় বিদ্রোহ হতে লাগল। সরকার সেসব বিদ্রোহ কড়া হাতে দমন করল। মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে ও নতুন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়তে লাগল। রাষ্ট্রের কাছে চাহিদা এবং তা পূরণ না হওয়ার কারণে এই ক্ষোভের সৃষ্টি হল। শাসক দল এবং সরকার তাদের জীবনযাত্রা কে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে বাঁধতে চাইলাে। তাদের সন্দেহের চোখে দেখতে লাগল। নাগরিক জীবনের প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ের মধ্যে নাক গলাতে শুরু করলাে। নাগরিক জীবন অতিষ্ঠ করে তুলল। মিথ্যা মামলা করে বিদ্রোহী নাগরিকদের কারাগারে নিক্ষেপ করল। নতুন রাষ্ট্র তার নখ দাঁত প্রদর্শন করল। নতুন সরকার হয়ে উঠল এক সর্বগ্রাসী রাষ্ট্র নামক যন্ত্র। এখন আমরা কতকগুলি প্রশ্নের মুখােমুখি দাঁড়ালাম।
প্রথমত: পুঁজি ও শ্রমের চিরাচরিত দ্বন্দ্ব যদি নতুন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও থাকে, তাহলে তাকে কি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলা যাবে?
দ্বিতীয়ত:, পন্য উৎপাদন এবং পন্য বাজারজাত করার যে ধারণা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে ছিল, নতুন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও সেই ধারনাই বহাল থাকল। তাহলে আমূল পরিবর্তন কী ঘটল?
তৃতীয়ত: পুঁজি ও শ্রমের দাসত্ব থেকে শ্রমিক এবং শ্রমের মুক্তি ঘটলাে কোথায়? চতুর্থত:, সমাজের উদ্বৃও সম্পদের সুষম বন্টন কীভাবে হবে, তার কোন দিশা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র দেখাতে পারলাে কি?
পঞ্চমত:, পুঁজিবাদের বাজার ব্যবস্থার বিলােপ কীভাবে সম্ভব- তার কোনাে চিন্তা বা সেই চিন্তার প্রয়ােগ নতুন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পেলাম কোথায়?
ফলে নতুন রাষ্ট্র যেটা করলাে তা হল রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের চর্চা। নতুন সােভিযেত সরকারের কাছে আমাদের যে প্রত্যাশা ছিল, উৎপাদনের সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা, সমস্ত উদ্ভূত সম্পদের মালিক হবে সমাজ। এককথায় রাষ্ট্র সমস্ত উৎপাদনের সামাজিকীকরণ করবে, তা অধরা রয়েই গেল।
হালিশহর ২-৪-২০২২
আমাদের আলোচনা
সোভিয়েত ইউনিয়ন নিয়ে আমি কখনও নিজে উদ্যোগ নিয়ে পড়াশুনা করেছি তা নয়। ফলে যা আমার ধারণা, সবই অন্যান্যদের প্রবন্ধ পড়ে, যেগুলি ঠিক সমস্যাটা বুঝতে সহায়তা করে না, বরং একটা ইতিহাসের পাঠ দেয়। বরং সমস্যাটা বুঝতে আমায় অনেক বেশি সাহায্য করেছিল প্রশান্ত ডন নামে উপন্যাসটা, যেটা নিয়ে লিখেওছিলাম। কিন্তু প্রশান্ত ডন দন-কসাক অঞ্চলের সমস্যাটুকু বুঝতে সহায়তা করেছিল, সামগ্রিকভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন বা বলশেভিক বিপ্লব পরবর্তী রাষ্ট্রের সমস্যাটা বুঝতে নয়। এছাড়া আর একটা সমস্যা আছে। সোভিয়েতের বেশিরভাগ লেখাতেই সমস্যা আড়াল করে একটা প্রপাগান্ডা (“সব খুব ভালো চলছে”) দেখানো হত। ফলে সোভিয়েতের সমস্যা বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় আকর তথ্যেরও সম্ভবতঃ ভালোই অভাব হবে। এম্পিরিক্যাল স্টাডি করা বেশ মুশকিল। এসব কারণেই ফলিত ‘সমাজতন্ত্র’ সম্পর্কে মূল্যায়ন তৈরি করা, যা পরবর্তীতে শিক্ষা হিসেবে কাজে লাগবে, তা বেশ মুশকিল।
এখানেই চলে আসে প্রশ্নটা, ক্ষমতার অছি হয়ে বা ক্ষমতা ‘দখল’ করে কি ‘সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা’ সম্ভব? আমরা যাপনবাদ -এ লিখেছি — ক্ষমতা হল বিশেষণের স্তর বা একটা মেটাফিজিক্যাল স্তরের বিষয়ী হিসেবে বাচন বা ভাষ্য তৈরি করে চলা ও তা বহাল রাখা, যে ভাষ্যে জনতা হল ওই বিশেষণের স্তরের বিষয়। বিষয়টি সামগ্রিকতায় আমরা ব্যাখ্যা করিনি, তার কাজ চলছে। কিন্তু একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। উদাহরনটা রাজনীতির চেনা উদাহরনগুলির চেয়ে একটু সরে, কিন্তু বোঝার জন্য খুবই উপযোগী। ধরা যাক, শিক্ষা। মূল কাজটা হল — শেখা। মূল ভার্বও তাই। শেখা কাজটার বিষয়ী কে? ছাত্ররা। ছাত্ররাই শেখে। তাহলে শিক্ষকদের কাজ কী? ছাত্রদের সহায়তা করা। শিখবে কিন্তু ছাত্ররাই। একজন শিক্ষকের কাজই নয় ছাত্রকে শেখানো। কারণ শেখা এই ক্রিয়াপদে বিষয়ী অবশ্যই ছাত্র। সে শিখবে। তার শেখার উপযোগী হিসেবে নিজের দায়িত্বটুকু বুঝে নিয়ে তা পালন করবে শিক্ষক। বহু শেখা হয় শিক্ষক ছাড়াই। যেমন আমরা অতিকথায় একলব্য-র কথা শুনেছি। আশেপাশেও অনেককেই দেখি। এখন ইন্টারনেট থেকেই অনেককিছু শেখা যায়, পড়ে পড়ে, দেখে দেখে, করে করে, শিক্ষক লাগে না। ফলে শেখার ক্ষেত্রে শিক্ষক যে অবশ্য প্রয়োজনীয়, তা নয়। কিন্তু কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সমস্ত শিক্ষকই মনে করেন, তিনিই বা তাঁরাই শেখান। আমরাও তাই ভাবি। অমুক ভালো শেখান, অমুক খারাপ শেখান। শেখা ক্রিয়াপদটাকে আমরা ব্যবহার করি এমনভাবে, তা হয়ে দাঁড়ায় শেখানো। আলাদা একটা ক্রিয়াপদই উদ্ভাবিত হয়ে গেছে। শেখানো। টিচ। এই যে শেখানো ক্রিয়াপদটা — বলা যেতে পারে, এই ক্রিয়াপদটিই হল ক্ষমতার ন্যারেটিভ বা ভাষ্য। শেখা নামক প্রক্রিয়াটাকে ক্ষমতা বিকৃত করে বানায় শেখানো। যেখানে শিক্ষক নামক মেটাফিজিক্যাল স্তরটি বিষয়ী। মেটাফিজিক্যাল, কারণ শেখার বিষয়ী হল ছাত্র। এখানে শিক্ষকের ভূমিকা ভার্চুয়াল। সে এই প্রক্রিয়ায় একটি সাহায্যকারী মাত্র। আরও এরকম অনেক সাহায্যকারী আছে। স্কুলের বেঞ্চি, বাবা মা, বই, ব্ল্যাকবোর্ড, ভিডিও — এরকম নানাকিছু। এসব নিয়ে শেখা নামক প্রক্রিয়াটার ভার্চুয়াল তৈরি। এগুলি সবই প্রয়োজন, কিন্তু কোনওটাই আবশ্যক নয়। আবশ্যক কেবলমাত্র যে শিখছে সে। মানুষ যত উন্নত হয়েছে, তত এই ভার্চুয়ালের বহর বেড়েছে। প্রথমে নিশ্চয়ই শেখা-র প্রক্রিয়ায় কোনও ভার্চুয়ালই ছিল না। নিজের আগের কাজ নিজে পর্যালোচনা করে মানুষ শিখত। তারপর আস্তে আস্তে ভার্চুয়াল বেড়েছে। এখন সেই ভার্চুয়ালের বহর অনেক বড়ো। যেমন ইউটিউব ভিডিও। এটা আগে মোটেই ছিল না। কিন্তু এখন শেখার প্রক্রিয়ায় এই ভার্চুয়ালটির মারাত্মক চাহিদা। শিক্ষকও একটি ভার্চুয়াল, শেখার প্রক্রিয়ায়। কিন্তু তার প্রস্তরীভবন/বস্তুকল্পায়ন (reification) করে তাকে যদি বিষয়ী বানানো হয়, এবং শেখার প্রক্রিয়াটিকে রূপান্তরিত বা বলা ভালো বিকৃত করে উপস্থাপিত করা হয়, যার নাম হল, শেখানো — তাহলে কী দাঁড়ায়। এটাই হল ক্ষমতা। রাষ্ট্র হল এই ক্ষমতারই বিস্তৃত রূপ। রাষ্ট্রক্ষমতার অছি হয়ে বা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে সমাজতন্ত্র তৈরি করা যায় কি না সেই প্রশ্নই মূল আলোচ্য। আমরা মনে করি, যায় না। রাষ্ট্রক্ষমতার নানা ধরনের রদবদল হতেই পারে। কিন্তু সে যা-ই দাঁড়াক, তার পক্ষে সম্ভব নয় ‘সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা’ করা। আমরা রাষ্ট্রক্ষমতা ওপর বিস্তারিত নোটস তৈরি করছি — মার্ক্সের শুরুর দিকে জার্মান ইডিওলজিতে তার ধারনা থেকে শুরু করে কমিউনিস্ট লিগের মুখপত্র লেখার সময়কার, এবং পরে প্যারি কমিউনের সময়কার — সেসব যেমন থাকবে, তেমনি আরো নানা সূত্র থেকে। এ ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক হস্তক্ষেপ হল ইভান মেজারোস-এর (যার পোস্থুমাস বই বিয়ন্ড দ্য লেভিয়াথান সদ্য বেরিয়েছে)।
শুভময়বাবু সোভিয়েত ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ বলে উল্লেখ করেছেন (সিএলআর জেমস, রায়া দুনায়েভস্কির -এর সম্ভবতঃ এই ধরনের নামকরণ আছে। টনি ক্লিফ?)। এই ধরনের কোনও নামকরণের প্রয়োজন আমরা দেখছি না। কারণটি খুব ভেবেচিন্তে অন্য কোনও বিকল্প নামকরণের জায়গা থেকে নয়। স্রেফ ‘বিরাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ’ এর কথা শুনিনি বলেই। কোথাও কি আছে? ছিল?
এখান থেকেই আরেকটি কথা বলা যায়। স্থানীয় ক্ষুদ্র উৎপাদন ও হাট-বাজার — তাকে কতটা পুঁজিবাদ বলা যায়? পুঁজি তো বহুদিন ছিল, পুঁজিপতিও ছিল। কিন্তু পুঁজিবাদ ছিল কী? আমি আর বিস্তারিত করতে চাই না। কারণ এর চেয়ে বেশি বিস্তারিত করলে এই প্রশ্নগুলি এসে যাবে, তাহলে কী ‘সমাজতন্ত্রে ক্ষুদ্র উৎপাদন ও হাট-বাজার থাকবে?’ ‘সমাজতন্ত্রে কি পণ্য থাকবে?’, ‘সমাজতন্ত্রে কি পুঁজি থাকবে?’ । আমাদের মনে হয়, সমাজতন্ত্রকে যদি একটি স্বর্গীয় এবং ইপক্যাল ব্যবস্থা হিসেবে কল্পনা না করা হয়, যদি তাকে একটা আন্দোলন হিসেবে কল্পনা করা হয়, যেখানে সামাজিক উদবৃত্ত, জীবন্ত শ্রমের প্রাধান্য, জাগতিক পরিসরের প্রাধান্য এবং সমতার পরিমাণ বাড়তে থাকবে (গুণগত ও পরিমাণগত র তর্ক এখানে প্রাসঙ্গিক নয়, ওদুটি যদি আদৌ খুব আলাদা অস্তিত্ব হয়, তাহলেও তারা নিজেদের মধ্যে খুবই জড়ামরি করে থাকে) — তাহলে ভালো হয়। সোভিয়েতকেও যদি সেইভাবে মূল্যায়ণ করা যায়, তাহলে সোভিয়েতকে আমরা সমস্যায়িত করতে পারি এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে শিক্ষা নিতে পারি।
শমীক (যাপনবাদ-এর একজন প্রস্তাবক)