বিধানসভা নির্বাচন এসে মনে করিয়ে দেয়, কে করবে আমাদের ভালো-মন্দের দেখভাল সেটা আমাদেরই ঠিক করার কথা। নির্বাচনী গণতন্ত্র আমাদের ‘শাসক’ নির্বাচনের বন্দোবস্ত, কিন্তু সে কী নীতি নিয়ে ‘শাসন’ করবে তা আমরা ঠিক করতে পারি না এই ব্যবস্থাপনায়। অর্থাৎ, বিধানসভা নির্বাচনের ফলে আমাদের দেখভাল করার দায়িত্ব যারা পাবে, আমরা ভোট দেওয়ার মাধ্যমে তাদের বলে দিতে পারি না — এই হল আমাদের ভালো–মন্দ — এইগুলো তোমরা করো।
তাই আমরা, আমজনতার একটি ক্ষুদ্র অংশ, এই লিফলেটের মধ্যে দিয়ে হবু ‘শাসক’ বা আমাদের ভালো-মন্দের হবু ঠিকাদার বা কনট্রাকটর-দের, তাদের কিছু নির্দেশ দিচ্ছি, আমাদের সামগ্রিক ভালো-মন্দ বিষয়ে। নির্দেশ, কারণ জনতা তার ভালো-মন্দের দেখভাল করার ঠিকাদারদের অনুরোধ বা দাবি বা আবেদন বা প্রশ্ন করে না, নির্দেশ দেয়।
১| অতিধনীদের ওপর অতিরিক্ত কর ও লেভি কীভাবে চাপানো যায় অনুসন্ধান করে তা চাপাও, এবং সেই অতিরিক্ত সরকারি আয় দিয়ে নিম্নলিখিত পরিষেবাগুলি সর্বজনীন হিসেবে (অর্থাৎ, ইচ্ছুক সবার জন্য বিনামূল্যে) ব্যবস্থা করো/চালু রাখো :
ক) উঁচুমানের খাদ্যশস্য, রবিশস্য, ভোজ্য তেল; রান্নার উপকরণ ও ইন্ডাকশন প্যাড; পানীয় ও গৃহস্থালীর কাজের জন্য পরিষ্কার জল
খ) পাকা বাড়ি যাদের নেই তাদের শৌচাগার ও রান্নাঘর যুক্ত দু-কামরার পাকা বাড়ি
গ) একশ’ ইউনিট উচ্চমানের বিদ্যুৎ
ঘ) উন্নত স্থানীয় গণপরিবহণ (ট্রেন, বাস, জলযান)
ঙ) উচ্চমানের পর্যাপ্ত ডেটা ও টকটাইম
চ) মাস্টার্স ডিগ্রি অবদি উঁচুমানের শিক্ষা
ছ) সমস্ত প্রয়োজনীয় ওষুধ, অতিপ্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যপরীক্ষা, হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা ও সার্জারি।
২| জাত-জাতি-ভাষা-লিঙ্গ-ধর্ম-আঞ্চলিকতা ইত্যাদির পরিচয়ের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা কেমন তা নিয়মিত উঁচুমানের সমীক্ষা করে সমতা–র বন্দোবস্ত করো :
ক) যারা সমীক্ষায় পিছিয়ে তাদের সংরক্ষণ, ভাতা, ইনসেনটিভ
খ) দিনে ও রাতে যে কোনও সময় মেয়েদের সর্বত্র যাতায়াতের নিশ্চয়তা।
৩| শ্রমজীবীতা–কে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য নিম্নলিখিত ব্যবস্থাগুলি করো :
ক) ইচ্ছুক সবার কাজের নিশ্চয়তা ও কাজ থাকার নিরাপত্তা
খ) বেতনভূক কাজের সময় দৈনিক অনুর্ধ আট ঘন্টা এবং পর্যাপ্ত ছুটি কঠোরভাবে লাগু করা
গ) সমকাজে সমবেতন
ঘ) ছোট্ট সংস্থা বাদে সমস্ত সরকারি বেসরকারি কারখানা ও সংস্থায় নির্বাচিত কর্মী ইউনিয়ন বাধ্যতামূলক
ঙ) মজুরি-সমতার দিকে (যেমন, সর্বোচ্চ বেতন সর্বনিম্ন বেতনের পাঁচগুণের কম)
চ) সরকারি নিয়োগে এবং উচ্চশিক্ষার মূল্যায়ন ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা
ছ) সমস্ত সরকারি শূণ্যপদ দ্রুত পূরণ ও অস্থায়ী কর্মীদের স্থায়ীকরণ
জ) শ্রমনিবিঢ় ও স্থানীয়ভাবে পরিকল্পিত অন্ততঃ একশ’ দিনের কাজের গ্যারান্টি
ঝ) সরকারি ও বেসরকারি সব জায়গায় অবসরপ্রাপ্তদের পর্যাপ্ত পেনশন/বেনেফিট-এর গ্যারান্টি
ঞ) নিম্ন-আয়ের স্বনিযুক্ত পেশাজীবীদের আংশিক সময়ের চুক্তিভিত্তক সরকারি কাজ
ট) কৃষিপণ্যের ন্যুনতম মূল্যের চেয়ে কম দামে ফসল কেনা নিষিদ্ধ করা
ঠ) চাষি, জেলে, তাঁতি ইত্যাদি খাদ্য-বস্ত্র উৎপাদনে স্বনিযুক্ত পেশাজীবীদের ভর্তুকি
৪| ভিন্ন যাপনের সহাবস্থান ও সহনশীলতা বৃদ্ধির জন্য নিম্নলিখিত বন্দোবস্তগুলি করো :
ক) মানুষের নানারকম যৌথতা, বিশ্বাস, আচার, আচরণ, সংস্কৃতি তথা যাপনের বৈচিত্র্য ও স্বকীয়তা অক্ষুণ্ণ রাখা
খ) সর্বত্র মুক্ত ও ভয়হীন মতপ্রকাশ
গ) ছোটো মিছিল/মিটিং/জমায়েত-কে অগ্রাধিকার
ঘ) সমস্ত সংস্থার স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ
ঙ) সরকারি বেসরকারি সমস্ত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত ছাত্র-ইউনিয়ন বাধ্যতামূলক
চ) ইউএপিএ সহ যে সমস্ত আইন বিচারের আগেই মানুষকে অপরাধী সাব্যস্ত করে দিয়ে বলে, এবার তুমি নিজেকে আইনের মাধ্যমে নির্দোষ প্রমাণ করো — সেগুলো বাতিল করা/বাতিলের আবেদন করা
৫| প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় নিম্নলিখিত ব্যবস্থাগুলি করো :
ক) শহরের পরিবেশের মধ্যে গাছপালা, উদ্যান, জলাশয় সহ প্রাকৃতিক পরিসর রক্ষা ও বাড়ানোর আইন
খ) নদী হ্রদ খাল বিল পুকুর ইত্যাদি জলাশয়, গ্লেসিয়ার, বুগিয়াল, সৈকত, মোহনা, নদীখাত, টিলা এবং বন বাঁচানোর জন্য আইন
গ) জৈব কৃষিজাত পণ্য এবং সারে ভর্তুকি
ঘ) সমস্ত জায়গায় সাইকেল নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়া; সাইকেল, রিক্সা, ও ছোটো-মোটর চালিত হালকা ও ধীরগতির গাড়ির জন্য সব বড়ো রাস্তায় আলাদা লেন
ঙ) ব্যক্তিগত গাড়ি-কে নিরুৎসাহিত করা
৬| প্রশাসন এবং বিচার, অর্থাৎ রাষ্ট্র বা ক্ষমতা-ব্যবস্থাটির এক্সিকিউটিভ বা রূপায়ণমূলক অংশটিকে দ্রুতগতি, নির্ভুল, পক্ষপাতহীন, এবং দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য সেখানে উন্মুক্ত (ওপেন সোর্স, ওপেন ডাটা, ওপেন ওয়েট, ওপেন সিস্টেম প্রম্পট) AI প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াও।
বিধানসভা নির্বাচনে আমরা আমাদের ভালো-মন্দের আগামী পাঁচ বছরের ঠিকাদার ঠিক করি, আমাদের সেই নির্বাচিত–দের এই ঠিকাদারি করার ক্ষমতা দিই। যদিও ক্ষমতার রাজনীতি সবসময় চায় এটা আমাদের ভুলিয়ে দিতে — যেন মনে হয়, ওরাই সব, নেতা-মন্ত্রী-জনপ্রতিনিধি-আমলা-বিচারকরাই আসল ক্ষমতাবান, আর আমরা হলাম এলি-তেলি।
যেমন, এই ভোটের মাধ্যমে আমরা যে আগামী বছর পাঁচেকের জন্য এই ঠিকাদার/কনট্রাকটর বা ‘শাসক’ নির্বাচন করব — প্রথমেই SIR এর মাধ্যমে আমাদের অনেককেই ভোটার তালিকা থেকেই বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেন? কারোর হয়ত বাপের সঙ্গে টাইটেল মেলেনি, কারোর বয়স সন্দেহজনক ঠেকছে ইত্যাদি। তাহলে এই যে আমাদের নির্বাচিত ‘শাসক’ — সে তো আমাদের সবার দ্বারা নির্বাচিত হলো না! তাহলে কি এই নির্বাচনী গণতন্ত্রের ব্যবস্থাটাই প্রশ্নের মুখে পড়ছে না?
যারা বাদ পড়ল, তাদের বলা হয়েছে নাম তুলতে। কিন্তু ব্যর্থতাটা কার? যারা বাদ পড়ল তাদের? নাকি যারা এদের বাদ দিল, তাদের? বাদ দিয়েছে ভারত রাষ্ট্র। অতএব প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, ভারত রাষ্ট্র কি এই আমজনতার-নির্বাচনী-গণতন্ত্র ব্যবস্থাটি টিঁকিয়ে রাখতে চায় আদৌ? নাকি তারা রাজতন্ত্র কায়েম করতে চায় ঘুরপথে, যে রাজা কোনও দেবতা ঠিক করে দিয়েছে বলে দাবি করা হবে, এবং ‘ধর্মভীরু’ ভারতবাসী তা মেনে নেবে? যদিও বিশ্বজুড়েই মানুষ এই ধরনের ‘ঈশ্বর’-প্রেরিতদের ‘শাসন’-ব্যবস্থা বিসর্জন দিয়ে দিয়েছে বহুদিন আগে।
নির্বাচনী-গণতন্ত্র ব্যবস্থা অনুযায়ী বিধানসভা নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি হয় তারাই, যারা সবচেয়ে বেশিজনের ভোট পায়। কিন্তু সে শুধু তাকে যারা ভোট দিল তাদের প্রতিনিধি হয় না, যারা দেয়নি, এমনকি যারা ভোটটাই দেয়নি, তাদেরও প্রতিনিধি হয়। অর্থাৎ, হবু ‘শাসক’ শুধু সমর্থকদের ‘শাসক’ নয়, সমর্থক-বিরোধী-নোটা-ভোটহীন সবার ‘শাসক’।
ধন্যবাদান্তে,
বঙ্কিম (9163093286), শমীক, সৌভিক, শ্রীদীপ, রামজীবন, পর্ণব, ভারতী, ফরিদা, নমিতা, বর্ণালী, রুবি, আবির, দীপা, বিজন, আবু সৈয়দ, অনির্বাণ, অরুনিমা, অন্তর, মানব, কৌশিক,..
আপনিও চাইলে জুড়ে দিতে পারেন আপনার নাম। এবং এই লিফলেট অন্যদের দিতে পারেন।
বিস্তৃত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ তর্ক বিতর্ক আলাপ আলোচনার জন্য এই লিঙ্কে যান https://www.japonbad.in