আমরা যাপনবাদের বয়ান শুরু করেছিলাম এই বলে — “যাপনবাদ-এ রক্তমাংসের মানুষ এবং তার প্রতিদিনের জীবন — সেটাই একটা মানুষের সব।” আমরা এখানে রক্তমাংসের মানুষ কি তা সহজ ভাষায় বলার চেষ্টা করছি।
রক্তমাংসের মানুষ হল মানুষ আসলে যা, সেটা। ব্যক্তিগত মানুষ বা ব্যক্তি মানুষ বা ইন্ডিভিজুয়াল হিসেবে মানুষকে দেখার চল বেশ আধুনিক একটা ব্যাপার। এমনিতে আমাদের গাঁ-গঞ্জে দু-প্রজন্ম আগেও কমবয়সীদের, মহিলাদের, এমনকি বড়োদেরও নাম ধরে ডাকার চল ছিল না। অমুকের বৌ, অমুকের মা, তমুকের ব্যাটা, ওই বাড়ির ছেলে বা মেয়ে — এভাবেই ডাকা হত। পারিবারিকভাবে ছেলেদের ছোটো, মেজো, সেজো, বড়ো ইত্যাদি বলে ডাকার চল ছিল। স্বামী স্ত্রী নাম ধরে ডাকত না পরস্পরকে। ওগো হ্যাঁগো কিগো থেকে শুরু করে এর মা ওর বাবা উনি তিনি সে তার — কোনও বিশেষ নাম নয়, সাধারণ নাম বা সবার নাম। সর্বনাম। নামকরণ-ই বরং ছিল একটা আনুষ্ঠানিক ব্যাপার। যাদের পরিবারে আনুষ্ঠানিকতার প্রচলন ছিল, উঁচু দিকের অবস্থাপন্ন জাতগুলিতে, সেখানে অনুষ্ঠান করে নাম দেওয়া হত, নইলে স্কুলে ভর্তি হবার সময় নাম দেওয়া হত। নামের মহিমা অনেকটাই শহুরে এবং আধুনিক ব্যাপার। নইলে নামকরণ করা হলেও নাম হত কোনো দেবতার নামে। এক গ্রামে একই নাম থাকত অনেকের। মিতে ব্যাপারটা বেশ প্রচলিত ছিল। তখন গ্রাম এবং পরিবার এবং পাড়া খুব মিশেমিশে থাকত। বেঁধেবেঁধে থাকত। এমনকি এক প্রজন্ম আগেও গ্রামে এবং শহরেও অহংকার ছিল একটা খারাপ ব্যাপার। এখন বাংলা বিজ্ঞাপনে অহংকারকে ভাল হিসেবে দেখানো হয় (“আমার অহংকার”)। তখন বই পত্তরেও লেখা থাকত — অহংকার পতনের কারণ। যেমন বিষয়ী হিসেবে ‘আমি’ ছিল যাকে বলে খুব-একটা-ভালো-জিনিস-নয়, তেমনি সমাজের কাছেও ব্যক্তির (বিষয় হিসেবে — ‘সে’, ‘তমুক’, ‘ওমুক’) খুব গুরুত্ব ছিল না।
ব্যক্তি বরং বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল রাষ্ট্রের কাছে। পুলিশ ধরলে লিখতে হত, নাম, বাবার নাম ইত্যাদি ইত্যাদি। স্কুলে ভর্তি হতে গেলে এসব লিখতে হত। আইনের চোখে একক হল ব্যক্তি। কেউ যদি বলে, আমি তখন গুলি চালিয়েছিলাম, কারণ অমুক আমায় পেছন থেকে গুলি চালাতে বলেছিল, বা তমুকের বইতে এরকম করার কথা লেখা ছিল বলে, ওসব বললে কিন্তু “সাহেব শুনবে না”। সাহেব শুনবে না — এও ছিল একটা প্রচলিত কথা। শহর আর গ্রামের সংযোগস্থলে বেশি প্রচলিত ছিল। কোর্টে উকিলের কাছে আসা গ্রামীন আসামীকে একথা শুনতে হত। অর্থাৎ তোমার কৃতকর্মের দায় তোমার। অমুক বলেছিল করতে, তমুক লিখেছিল বইতে এমন করতে — এসব নয়। রাষ্ট্রের চোখে ব্যক্তিই সব। ব্যক্তির অস্তিত্ব বা গুরুত্বের মৌলিক পূর্বশর্ত তাই আধুনিকতা। তা যে খুব খারাপ এমন কথা বলা হচ্ছে না। অনেক সময়ই ব্যক্তির গুরুত্ব না থাকায় ব্যক্তি অদৃশ্য হয়ে যেত সমাজে। অনেক সময় ছায়ায় ঢাকা পড়ে যেত। সমসাময়িক বহু সাহিত্যে ‘আমি’-র চলে আসার কথা আছে। ব্যক্তির গুরুত্ব তাই সময়ের ফসল। ঘটেছে। এবং তাতে আধুনিক রাষ্ট্রের বড়ো ভূমিকা আছে। এখন প্রশ্নটা হল — এই ইন্ডিভিজুয়াল বা ব্যক্তি — তা কতটা হয়ে-ওঠার ব্যাপার, আর কতটা যাকে বলে আসল বা জাগতিক ব্যাপার।
কয়েক বছর আগে সামাজিক গণমাধ্যমে বাদানুবাদে উত্তপ্ত বাতাবরণ-এ তখন, কার্গিল যুদ্ধে (১৯৯৯) মৃত এক সৈনিকের অসমসাহসী কন্যা লিখেছিল — “পাকিস্তান আমার বাবাকে মারেনি, যুদ্ধ আমার বাবাকে হত্যা করেছে”। তার উত্তরে প্রাক্তন ক্রিকেটার এবং উগ্রজাতীয়তাবাদী বীরেন্দ্র সেহবাগ লিখেছিলেন, “আমি ট্রিপল সেঞ্চুরি করিনি, আমার হাত করেছে”। প্রথমটা নয়, দ্বিতীয়টি আমাদের আলোচ্য। সত্যি কথা বলতে কি, বীরেন্দ্র সেহবাগের হাত-পা ই ট্রিপল সেঞ্চুরি করেছে। যে কোনও খেলা বা পারফর্মেন্সের ক্ষেত্রে বহিঃস্থ অঙ্গগুলি (হাত পা) যাতে মাথার (মধ্য মস্তিষ্ক) নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে নিজেরাই চলতে পারে — সে জন্য প্র্যাক্টিস করানো হয়। প্র্যাক্টিস কোনও কলা বা বিদ্যাকে যাকে বলে হাতে বা পায়ে এনে ফেলে। মাথা সেখানে আপদ। এ তো গেল খেলা বা পার্ফর্ম্যান্সের কথা। আমরা এমনি সামাজিক জীবনে কী দেখি? চোখ কি খুব মাথার বারণ মানে? কেউ যদি আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসে, তাহলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা হেসে দিই, তাই না? কেউ যদি খুব ভালো বলে, তাহলে আমরা তন্ময় হয়ে শুনি। ফলে আমাদের মাথা নিরপেক্ষভাবে আমাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলির পাশাপাশি কানেকশন বা যোগাযোগ আছে। হাতের সঙ্গে হাতের, দাঁতের সঙ্গে দাঁতের, মুখের সঙ্গে কানের। ইত্যাদি ইত্যাদি। অনেকে বলে যৌনতা নাকি মস্তিষ্ক নিরপেক্ষ ব্যাপার এবং নানারকম দেহরসের বাধ্যতা। আর অল্পবয়সীদের তো কথাই নেই, “হাতে পায়ে লক্ষ্মী”। আমাদের শরীর বহু কোটি কোষ দিয়ে, বহু লক্ষ কলা দিয়ে বহু হাজার প্রত্যঙ্গ দিয়ে এবং অনেকরকম অঙ্গ ও বেশ কয়েকটি অঙ্গতন্ত্র দিয়ে তৈরি। এছাড়াও আছে উজবুক সব ব্যাকটিরিয়া এবং ভাইরাস –বহু লক্ষ কোটি। প্রত্যেকেই কিন্তু স্বাধীন গঠন, এবং নিজস্বতা সম্পন্ন। এমনকি জীববিজ্ঞানের গবেষণাপত্রগুলিতেও অনেকসময় বাক্য লেখার সময় এদের একেকটিকে কর্তাব্যক্তির বা বিষয়ীর স্থান দেওয়া হয়। এদের সবাইকে নিয়েই আমাদের যাকে বলে “আমি” বা “সে”। ফলে আমরা যখন “আমি” বা “সে” বলি, আমরা তার ওপর এক বিরাট দায়িত্ব আরোপ করি — তার ভেতরের এইসব বিষয়ী বা “আমি” দের অস্বীকার করা-র। আমরা যেন বলেই দিই, ভেতরের ওইসব “আমি”দের যাবতীয় গোলযোগের দায় তোমার। বেসিক্যালি, তোমার “মধ্য মস্তিষ্ক”-র। আমার হাত, আমার পা, আমার চোখ, আমার পেট, আমার হরমোন — সব কিছুর জন্য আমি দায়ী। আইনের চোখে বা রাষ্ট্রের চোখে তো বটেই। আধুনিক সমাজ কাঠামোও তৈরি হয়েছে এই দায় নিয়ে। পাশে থেকে যাকে দেখতে লাগে স্বাধীনতা, আত্মনির্ভরতা, বিচ্ছিন্নতা — ভেতর থেকে দেখলে — মানে ধরা যাক, যে দেখছে সে যদি হাতের বাইসেপস মাসলের মধ্যে থেকে দেখে — সে দেখবে, ব্যাটা এই গোটা কাঠামোটাকে কী একখানা অসম্ভব দায়ই না নিতে হচ্ছে। মাথা আর কত পারবে!! বেচারা!!
রক্তমাংসের মানুষ এই ব্যক্তি বা ব্যক্তিগত বা ইন্ডিভিজুয়াল-এর ধারনার অস্বীকৃতি। সে যে আসলে বহু, ভাঙা, ডিভিজুয়াল — সেটার অকপট স্বীকারোক্তি। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া যায়, ওইসব ভেতরের সবকিছুর দায় এই অবয়বে আমিরই বা আমার মধ্য মস্তিষ্কের, ভেতরের কথা ধরলে চলবে না, তাহলে বাইরের ব্যাপারগুলোই একবার খতিয়ে দেখা যাক। বাইরের ব্যাপার খতিয়ে দেখার সময় ধরে নেওয়া হচ্ছে, আমি অখন্ড, নিরবিচ্ছিন্ন, আমার ভেতরের সমস্ত কিছুর সংহত উপস্থাপনা।
কিন্তু সেই সংহত আমিও নিজের প্রতিনিধি নয়। হ্যাঁ, আমরা অনেক সময়ই অন্যের জন্য ভাবি, অন্যের মতো করে (অন্যের জায়গা থেকে) ভাবি, অন্যের জন্য করি, অন্যের করি, অন্যের জায়গা থেকে করি — এবং হ্যাঁ, নিজেরটা বাদ দিয়ে। অনেকে ভাবতে পারে — যারা স্বার্থপর, তারা করে না। তারাও করে। কোনও না কোনও সময় করে। ফের করে না। আবার করে। করে না, কারণ আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা স্বার্থপর হতে এবং থাকতে বাধ্য করে। সারাক্ষণই কানের কাছে মন্ত্রণা দেয় — স্বার্থপর হও। অন্যের জন্য কিছু কোরো না। আগে নিজেরটা গোছাও। তারপর অন্যদের দেখবে। পপুলার কালচারেও তার পুনরাবৃত্তি চলে — “নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছি”। যে নিজেরটা গোছায় না, তাকে দেখানো হয় পরাজিত, বোকা, গাণ্ডু, স্যাক্রিফাইসিং, দুঃখী, অনুশোচনাগ্রস্ত, অকালে মরণপ্রবণ হিসেবে, এবং তার জন্য দায়ী করা হয় তাকেই। ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারা নীতার আকুল আর্তি “দাদা, আমি কিন্তু বাঁচতে চেয়েছিলাম” অভাব পেরোতে চাওয়া বাম জমানার বাংলায় সামাজিকভাবে ধ্বনিত হয়নি, বরং প্রতিধ্বনিত হয়েছে দালানবাড়িগুলির চার দেওয়ালের মধ্যে — আগে নিজেরটা গোছাও — বিশেষতঃ বিশ্বায়নের দুই দশক-এ (১৯৮৫-২০০৫)। এসব বিশাল বন্দোবস্ত পেরিয়েও লোকে অন্যদের জন্য ভাবে, করে ইত্যাদি এবং বলা যায়, তা করতে বাধ্য হয় কতকটা। প্রত্যেকে, নানা সময়। বন্ধুত্ব যেমন অবশ্যম্ভাবী একটি ব্যাপার, বন্ধুত্বের মৌলিক জায়গাই হল তার ইচ্ছে অনিচ্ছেকে গুরুত্ব দেওয়া। যে কোনও সামাজিক মেলামেশা অন্যকে প্রায়োরিটি না দিলে হয় না। যৌনতা তো সরাসরি অন্যকে বিষয়ীত্ব প্রদান, নইলে তাতে কোনও মজা নেই। যে কোনো সাংগঠনিক মেলামেশায় অন্য থাকে। আর কিছু না হোক, উদ্বেগে মানুষ অন্যদের কথায় চলে। দুঃখে মানুষ নিজেকে হারিয়ে ফেলে অন্যের কথায় চলে। অসুস্থ হলে বা বিপাকে পড়লে তো কথাই নেই। ফলে, অন্যের জন্য চলা, অন্য হয়ে চলা, অন্যের কথায় চলা — এ হল সামাজিক মানুষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মানুষ না হলেও পোষ্য, বা কোনও ঠাকুর, বা স্বপ্ন — কিছু না কিছু এই অন্যের জায়গা নেয়।
সরাসরি অপরের বা অন্যের প্রতিনিধিত্ব যদি বা যখন না করা হয়, তাহলেও অন্যের জায়গা নেয় নিজেরই স্মৃতি। যে মানুষটি আজ বৃদ্ধ হয়েছে, দুনিয়ার হিসেব নিকেশ মোটামুটি নিয়ে ফেলেছে, সেও কিছুতেই চিন্তা করার সময় বা কিছু করার সময় নিজের যৌবনের নিজেকে এড়িয়ে ভাবতে পারে না, তার অজান্তেই তার মধ্যে সে চলে আসে। তিন দশক কলকাতায় কাটিয়ে ফেলা মিলেমিশে যাওয়া মানুষেরও কথায়, স্বরে, কাজে, বন্ধুত্ব করার সময় রয়ে যায় ‘বরিশাল’। অতীতও যদি কাটিয়ে দেওয়া যায়, তাহলেও রয়ে যায় ভবিষ্যৎ। কাল-এর চিন্তা ব্যক্তিকে কিছুতেই বর্তমানে থাকতে দেয় না। কাল-এর চিন্তা ‘দূষিত’ করে বর্তমানকে। বয়স হয়ে গেলে কী করে চলবে, এই চিন্তায় বয়স থাকতে থাকতে ভোগবিলাস করতে পারি না আমরা। মনের মধ্যে খিটিমিটি লাগে — কত টাকা বেরিয়ে গেল। আড়ব্যক্তি হল ব্যক্তির এই নিজের বাইরে চলে যাওয়া, আশেপাশে চলে যাওয়া, অতীতে চলে যাওয়া, ভবিষ্যতে চলে যাওয়া, এবং অবশ্যই নিজের ভেতরের অসংখ্য “আমি”গুলি অস্বীকার করে তাদের উপস্থাপিত করা — একইসাথে — এই সবকিছু নিয়ে। কোথায় ব্যক্তি? কোথায়!
রক্তমাংসের মানুষ হল এই ভাঙাব্যক্তি এবং আড়ব্যক্তি। আধুনিক ও পুঁজিবাদী যুগের ব্যক্তিত্বের দাবি যার কাছে আরোপ।
Pore valo lageche.
Apekhay roelam r o lekhar